মিনহাজ আবেদিন
বিশ্ব মহামারিতে পরিণত হওয়া চলমান করোনা ভাইরাস বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দারিদ্র্যের চরম দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। সেটা আমরা বিভিন্ন দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা ও মিডিয়া হাউজগুলোর দিকে তাকালেই দেখতে পাই। শুধু প্রতিরোধেই নয় অর্থনৈতিকভাবেও করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অল্প আয়ের মানুষগুলো আর্থিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হচ্ছে। তেমনি বাংলাদেশেও লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। আর এই অবস্থায় দেশের যারা অসহায়, হতদরিদ্র, শ্রমিক, গরিব ও অসচ্ছল তারা অর্থকষ্টে ভোগছে প্রতিনিয়ত।
দুর্যোগকালীন এই মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অসচ্ছল মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দেশের বিত্তবানরা। সাহায্য করছে অসচ্ছল মানুষদের। কেমন সাহায্য। এ সাহায্য কি একনিষ্ঠ। শুধু গরিবদের অভাব পূরণ করার উদ্দেশ্যেই কি। না, এই সাহায্য করার উদ্দেশ্য ছিল সমাজ, দেশ জাতির কাছে তার নিজেকে প্রকাশ করার, জনপ্রিয় করার, লোক দেখানোর। কিন্তু তাও অপ্রতুল। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালেই এই সব কার্যক্রম বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা না।
‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই ব্রত নিয়েই এগিয়ে আসা উচিত ছিল তাদের। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য এ সাহায্য মানবিকতার হাতকে প্রসারিত না করে লোক দেখানোর গণ্ডিতেই আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
লালসালু উপন্যাসটি হয়তো কমবেশি সকলেই পড়েছি। সেখানে এরকম একটি বাক্য আছে যে ‘শস্যের চেয়ে টুপি বেশি’। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখি ‘ত্রাণের চেয়ে সেলফি বেশি’। তাই যদি না হতো তবে একজন মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে ১০-১২ জন মিলে ক্যামেরার সামনে এসে পোজ দিয়ে সবাইকে সেটা দেখিয়ে বেড়াত না। বর্তমান সময়ে এমন দৃশ্য বিরল নয়। সম্ভবত আমরা ছাড়া এমন কাজ আর কেউ করতে পারে না। একজন দরিদ্র মানুষকে ১০ টাকার ত্রাণ দিতেও ১০-১২ জন মানুষের প্রয়োজন হয়, যা আমাদের মানসিক নগ্নতার চিত্রই হয়তো তুলে ধরে। আসলে এই মানসিকতাই কি চেয়েছি আমরা? ত্রাণ দিয়ে সেলফি তোলা, ফটোসেশন করা কতটুকু ভালো কাজ। ‘সোনার বাংলা’ গড়তে যে সোনার মানুষের প্রয়োজন তাদের মানসিকতা কি এমনই হওয়া উচিত?
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রচারটাই এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ছবি তুলেই বেশি তৃপ্তি পাচ্ছে। ত্রাণ কোথায় পৌঁছাচ্ছে কি না, কতটুকু ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে অথবা যারা ত্রাণ পাওয়ার যোগ্য তারা ত্রাণ পাচ্ছে কি না, তার চেয়ে ত্রাণ বিতরণের সময় ছবি, সেলফি তোলার গুরুত্বটাই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ত্রাণ কোনো দান নয়। দুর্যোগকালীন রাষ্ট্রের কাছ থেকে ত্রাণ পাওয়া নাগরিকের অধিকার। কিন্তু ত্রাণ বিতরণের নামে এই অসহায়, অসচ্ছল, হতদরিদ্র, শ্রমিক, নিম্নবিত্ত ও সাধারণ মানুষদের যে মানসম্মানহানি ও হয়রানি করা হচ্ছে এর দায় কে নেবে?
সাহায্যের নামে ফটোসেশনের এই প্রতিযোগিতায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও পিছিয়ে নেই। দেখা যায় নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের নাম, ছবিসংবলিত ত্রাণের পণ্যের প্যাকেট। আবার অনেকে রাতের বেলায় বাড়ি বাড়ি গোপনে ত্রাণ বিতরণ করলেও ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেই বেড়াচ্ছে। অনেকেই আছে, যাদের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও শুধু ত্রাণের জন্য ক্যামেরার সামনে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার এমনও দেখা গেছে যাদের ত্রাণ প্রয়োজন কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ত্রাণ নিচ্ছেন না।
এদিকে এই দুর্যোগে সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচিত ডিলারদের মাধ্যমে এইসব চাল অসচ্ছল মানুষগুলো কিনতে পারবেন। কিন্তু যে চাল জনগণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি পর্যাপ্ত নয়। আবার অনেক এলাকায় চালগুলো জনগণের কাছেই পৌঁছাচ্ছে না।
সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ হয়তো বাজেট পেশ করেন। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান পর্যায়ে এসে এ ত্রাণসামগ্রী চুরি করার নজির মিলেছে সীমাহীন। বৈশ্বিক দুর্যোগের এই মুহূর্তে আমরা জনপ্রতিনিধিদের কাছে যতটা দায়িত্বশীল আচরণ আশা করেছিলাম তার ছিটেফোঁটাও মিলছে না কোথাও কোথাও। অবৈধভাবে ওএমএসের চাল বিক্রির কারণে আওয়ামী নেতা গ্রেফতার, ত্রাণের চালসহ ইউপি সদস্য আটক, ৫৫৫ বস্তা সরকারি চাল জব্দ, ত্রাণের আড়াই টন চাল উদ্ধার এ ধরনের সংবাদগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের হতাশ করে চলেছে। অসাধু এসব ব্যক্তিকে দ্রুত শাস্তির আওতায় এনে জনগণের আমানত ত্রাণসামগ্রী বণ্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সূচিত জনগোষ্ঠী সূচিতই থেকে যাবে।
করোনা এবং মৃত্যু শব্দ দুটো এখন মানুষের কাছে সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক এই সময়েও দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ত্রাণ চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। মানুষের ভেতর বিরাজ করছে অস্থির মনোভাব।
এই আগুনের সময় ঠিক কত দিন পর্যন্ত অবস্থান করবে তার নির্দিষ্ট সময়সীমা আমরা কেউই জানি না। এ সময়টা আসলে নিজেকে প্রমাণ করার। কতটুকু সময় খেটে খাওয়া মানুষদের পাশে থাকতে পেরেছি। কত সময় করোনা আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবারের মানুষগুলোর মনে সাহস সঞ্চার করেছি। এই দুর্যোগে সংকটে থাকা মানুষগুলোর পাশে থাকাই স্বস্তির নয় কি? ত্রাণের নামে সেলফি, ফটোসেশন, প্রতারণা আর কত? দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকসহ প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের জনগণের পাশে থেকে সংকট উত্তরণের চেষ্টা করা এই সময়ের দাবি। করোনাকালীন পৃথিবীটা হোক মানবিক।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
