চিন্তায় মননে কোভিড-১৯-এর প্রভাব ও তার প্রতিকার

আপডেট : ০৭ মে ২০২০, ২১:৩৪

ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ

যেকোনো Situation বা object বা person আপনি তাতে কতটুকু আতঙ্কিত হবেন তার সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে আপনি তা কীভাবে দেখছেন এবং তাকে কীভাবে গ্রহণ বা বর্জন করছেন তার ওপর, অর্থাত্ আপনার Cognition-এর ওপর। আপনার Cognition মানে হচ্ছে আপনার thinking process অর্থাত্ আপনি যে প্রক্রিয়ায় চিন্তা করেন বা সোজা কথায় আপনার চিন্তার প্রক্রিয়া। এখন এই Cognition যখন সঠিক রাস্তায় চলে তখন আমাদের চিন্তা, মনন, আবেগ, জীবন সবই ঠিক থাকে। আর আমাদের Cognition যখন biased হয় বা distorted হয় অর্থাত্ বক্র রাস্তায় চলে বা বিকৃতভাবে কাজ করে তখন আমাদের চিন্তা, মনন, আবেগ, জীবন সবই উলটে-পালটে যায়। আমাদের জীবন স্বাভাবিক গতি হারায়, জীবনের নানা ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় তথা আমাদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, জীবনের নানা ক্ষেত্র বলতে আমরা কী বুঝি? একটু খেয়াল করলে দেখবেন—যে জীবন আমরা যাপন করি প্রকৃতপক্ষে তা অনেকগুলো জীবনের সমষ্টি। যেমন : ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন, শিক্ষাজীবন, সামাজিক জীবন, ধর্মীয় জীবন ইত্যাদি। যখন কোনো ঘটনা বা অন্য যা কিছু আমাদের Cognition-কে অস্বাভাবিক আন্দোলনে আন্দোলিত করে যে আমাদের জীবনের এ ক্ষেত্রগুলো গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়, তখন আমাদের Cognition বা চিন্তার প্রক্রিয়াকে তার ত্রুটিগুলোকে খোঁজ করে সেগুলোকে সংশোধন তথা আমাদের Cognition-কে সঠিক রাস্তায় চালানোর প্রয়োজন পড়ে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কিসের ওপর আমাদের Cognition কাজ করবে বা কোন্ বিশেষ point-এর ওপর Cognition তার কাজ শুরু করবে? আমরা যদি সহজভাবে চিন্তা করি—আমাদের চিন্তার প্রক্রিয়া শুরু হয় কোনো ঘটনা, কোনো বস্তু কিংবা কোনো অবস্থাকে কেন্দ্র করে? পরিবেশ, পরিবেশের পরিবর্তন, জীবনের গতিধারার পরিবর্তন, যে কোনো ক্ষুদ্র বা বৃহত্ ঘটনা বা অবস্থা ইত্যাদি সবকিছুই আমাদের cognitive প্রক্রিয়াকে stimulate করে। এই Cognition আবার ব্যাপক পরিসরে আমাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের আবেগ আবার আমাদের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ব্যবহার আবার আমাদের Cognition-কে প্রভাবিত করে অর্থাত্ একটা viscious circle-এর মতো তৈরি হয়। ফলত একবার কোনো negative বা নেতিবাচক চক্রের মধ্যে ঢুকে গেলে আমাদের Cognition ক্রমান্বয়ে নেতিবাচক চিন্তার দিকে ধাবিত হতে থাকে। আমাদের চিন্তার জগত্, মনন, জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অনেকক্ষেত্রেই অযথা আতঙ্কিত হই, বিষণ্ন হই, হতাশাগ্রস্ত হই। ফলে আমাদের জীবন হয়ে ওঠে বিষাদময়, জীবনের ক্ষেত্রগুলো গুরুতরভাবে আহত হয়, দগ্ধ হয়—এক কথায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। আমরা তখন অন্তর্জগত্ এবং বহির্জগত্ সর্বক্ষেত্রেই জীবনের স্বাভাবিক গতিধারা হারিয়ে ফেলি।

প্রসঙ্গ হচ্ছে করোনা বা কোভিড-১৯ এবং এর মানসিক প্রভাব। এর সঙ্গে অনেকগুলো ঘটনা, পরিবেশ, অবস্থা জড়িত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা দুটি সুস্পষ্ট দিক বা পরিস্থিতির উপস্থিতি লক্ষ্য করব। যেমন: বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকে আমরা যদি দৃষ্টি দেই—কোভিড-১৯ সমগ্র পৃথিবীজুড়ে একটা pandemic অবস্থায় আছে। এই করোনা ভাইরাসের বিস্তারের impact বা perspective বা পরিপ্রেক্ষিত কী কী হতে পারে। এবং কোথায় কোথায় হতে পারে। অনেকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই হতে পারে। যেমন—১. এ ভাইরাস আপনাকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করবে। আপনি রোগাক্রান্ত হবেন। কারো কারো ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। যদিও আক্রান্ত হওয়া এবং সুস্থ হওয়ার তুলনায় তার হার অনেক কম; ২. মানসিক প্রভাব, ৩. সামাজিক প্রভাব, ৪. অর্থনৈতিক প্রভাব, ৫. ধর্মীয় প্রভাব ইত্যাদি নানাবিধ perspection-এ করোনা বা কোভিড-১৯ আমাদের আন্দোলিত করছে এবং হয়তো বা আরো কিছুদিন করতে থাকবে। এখন individually প্রতিটি perspection বা পরিপ্রেক্ষিত বা impact যা-ই বলি, প্রত্যেকেরই আলাদাভাবে মানসিক প্রভাব আছে।

প্রতিটি ক্ষেত্র যা কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নানাবিধ মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ সময় মানসিকভাবে সুস্থ থাকা, মনকে স্থিতিশীল রাখা অনেক জরুরি। কারণ চিন্তার জগতে ফাটল ধরে গেলে আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। মানসিকভাবে কিছুতেই আর যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারবেন না।

প্রশ্ন হচ্ছে, কী রকম মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি বা করোনা আমাদের মনে কী প্রভাব ফেলছে? এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য আমরা অনেকেই মানসিক  রোগী না হয়েও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মূলত মানসিক বিপর্যস্ততার মধ্যে রয়েছে : উদ্বেগ বা Anxity, মানসিক চাপ, ভয়, অতিরিক্ত আতঙ্ক বা panic attacks। মানসিক অস্থিরতার শারীরিক প্রকাশ যেমন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের কারণে বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় করা—মনে হচ্ছে এখনই অজ্ঞান হয়ে যাব ইত্যাদি। অনিদ্রা। হিস্টেরিয়া। পরবর্তী সময়ে কারো কারো মধ্যে post traumatic stress disorder বা PTSD দেখা দিতে পারে।

প্রতিটি মানসিক অবস্থা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক অবস্থায় একেক রকম। যেমন: একজন ব্যক্তি যিনি মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগে ভোগেন কিন্তু কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হননি তার অবস্থা এবং যিনি আক্রান্ত হয়েছেন তার অবস্থা এবং উদ্বেগের মাত্রা ভিন্ন রকম হবে এবং চিকিত্সাও হবে ভিন্ন রকম। আবার এসব পরিস্থিতিতে যারা আগে থেকেই কোনো লঘু মানসিক ব্যাধি যেমন অহেতুক ভীতি বা শুচিবাইগ্রস্ত বা বিষণ্নতাজনিত মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে বর্তমান anxity-র সঙ্গে সঙ্গে রোগের উপসর্গগুলো বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে এই পরিস্থিতিতে যে কোনো মানুষেরই anxity বা stress অনুভব করা স্বাভাবিক। কিন্তু এটা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে—তখন অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার দীর্ঘদিন কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন বা লকডাউনও নানা রকম মানসিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে এই সময়টাতে আমরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারি। এই সাময়িক পরিস্থিতিতে মানসিক জটিলতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিষণ্নতা, বিরক্তি, মেজাজ বা রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা, হতাশা এমনকি দাম্পত্য কলহ। উদ্ভূত এই আতঙ্কিত, অস্থির এবং পেনডেমিক পরিস্থিতিতে আমরা কিভাবে মানসিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, সে সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।

যারা মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগে ভোগেন তারা ঘন ঘন করোনার আপডেট জানতে যাবেন না, সেটা গুগল সার্চ দিয়েই হোক, টিভিতেই হোক বা ফেসবুক—যেখান থেকেই হোক না কেন। আপনার এই অবসর অলস সময়টাকে কোনো প্রোডাকটিভ বা ইতিবাচক কাজে, চিন্তায় ব্যয় করুন। এই সাময়িক অবসর আপনাকে আপনার নিজের দিকে তাকানোর একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। একবার চিন্তা করুন তো এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে আমরা সারাক্ষণ শুধু ছুটে চলেছি। আরো অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক অবস্থানের উন্নতি, প্রতিষ্ঠা—সারাক্ষণ শুধু এর পেছনেই ছুটছি। আমাদের ভেতরের মানুষ, আমাদের অন্তর্গত যে সত্তা তার দিকে তাকানোর সময়ই আমরা পাই না। এই সময়ে সেই অন্তর্নিহিত ‘আমি’কে develop করার একটা উদ্যোগ আমরা নিতে পারি। যদি কোনো হবি বা শখ থাকে তার চর্চা করুন, গভীরতা উপলব্ধি করুন। পরিবারের সঙ্গে, বাচ্চাদের সঙ্গে কোয়ালিটিপূর্ণ সময় কাটান। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই চিন্তা করে বিছানা ছাড়ুন যে আজ সারাদিন আমাকে অনেক সমস্যার মধ্যদিয়ে যেতে হবে; আমি আমার মতো করে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করব। হয়তো বা অনেকক্ষেত্রেই সফল হবো না, তাতে কিছু যায় আসে না—আমি আমার মতো করে যুদ্ধটা চালিয়ে যাবো এবং আমি আমার মতো করেই সফল হবো। নিয়মিত সাধ্যমতো এবং পরিমাণমতো শরীরচর্চা করুন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো একটি ইতিবাচক পদ্ধতি বা Positive coping style নিজের জন্য তৈরি করুন। অবশ্যই এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, একদিনেই তৈরি হবে না। চেষ্টাটা শুরু করুন এবং চালিয়ে যান। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটাবেন, মোকাবিলা করবেন তা নিয়ে একটা পরিকল্পনা তৈরি করুন। পরিকল্পনা শতভাগ সফল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আপনি আপনার মতো চেষ্টা করুন। relaxation, meditation ইত্যাদি বিষয় এ সময়ে বেশ কার্যকর।

n লেখক : সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

[email protected]