করোনার প্রভাবে রেমিট্যান্সে বড়ো ধাক্কা

আপডেট : ০৮ মে ২০২০, ২১:১১

n এম এ মাসুম

বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাসে প্রবাসী আয়ে ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১০৮ কোটি ১০ লাখ ডলার  রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত বছরের এপ্রিলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সে হিসেবে গত বছরের একই মাসের চেয়ে এপ্রিলে রেমিট্যান্স আহরণ প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ কমেছে। আগের মাস মার্চে রেমিট্যান্স আসে ১২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের। অর্থাত্ এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে রেমিট্যান্স আসা প্রায় বন্ধ। সীমিত আকারে কিছু রেমিট্যান্স আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এখন মধ্যপ্রাচ্যেও করোনার আঘাত প্রবল হচ্ছে। এছাড়া বিদেশে অধিকাংশ এক্সচেঞ্জ হাউস বন্ধ। ফলে রেমিট্যান্সের দরজা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে যেসব দেশ থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসে, তার সব গুলোতেই ছড়িয়েছে করোনা ভাইরাস। ফলে করোনার কারণে প্রবাসী শ্রমিকরাও ভালো নেই। আবার এসব দেশে নতুন করে শ্রমিক পাঠানো আপাতত সম্ভব হবে না। ফলে আগামীতে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।

বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, ওমান, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি, বাহরাইন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসছে। এর বাইরে সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান ও জার্মানি থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। কিন্তু এই ১৫ দেশের অধিকাংশই বর্তমানে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। করোনার মহামারিতে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স ধসের কারণে তিন ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে দেশে প্রবাসীদের এক কোটি পরিবার। প্রবাসে চাকরিচ্যুত ও মজুরি কমে যাওয়ায় অর্থ সংকটের মুখে পড়ে দরিদ্র হবে অনেক পরিবার।

প্রবাসীদের পরিবার নিয়ে এমন শঙ্কা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে। প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়েছে—করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়াতে এর মাত্রা হবে আরো বেশি। সম্প্রতি ‘ডিকলাইন অব রেমিট্যান্স ইন রিসেন্ট হিস্ট্ররি’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে বিশ্ব ব্যাংক। রেমিট্যান্স প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিট ম্যালপাস বলেন, আগামী ২০২১ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো রেমিট্যান্স ধসে কিছুটা উত্তরণ ঘটাতে পারবে। আশা করা যায়, সে বছর রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিক কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। যে কারণে ঐ দেশ চাকরি থেকে কর্মী ছাঁটাই ও মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে। আমাদের অনেক প্রবাসী এসবের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে রেমিট্যান্সের ওপর।  ফেরত আসা প্রবাসীদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স ধসের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রবাসীদের মজুরি কমছে, চাকরিচ্যুত হচ্ছেন অনেকে। সেখানে আরো বলা হয়, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৫৫ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাওয়া গেছে। কিন্তু ২০২০ সালে করনোর কারণে তা কমে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে আসবে। অর্থাত্ করোনার মহামারির প্রভাবে রেমিট্যান্স কমবে ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রেমিট্যান্স কমবে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কমবে ২২ দশমিক ১ শতাংশ। যেখানে ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় হ্রাস পাবে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, আফ্রিকায় ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিকে কমবে ১৩ শতাংশ।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রেমিট্যান্স নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে দারিদ্র্যবিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনগ্রসর পরিবারগুলোতে উন্নত ব্যয়ের সক্ষমতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রবাসীদের পরিবারে সন্তানদের শিক্ষার পেছনে ব্যয়ে সক্ষমতা বেড়েছে এবং পরিবারের শিশুশ্রম নিরসণে ভূমিকা রাখছে। এখন নতুন করে এসব বিষয় ফিরে আসা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

সবমিলিয়ে করোনা ভাইরাস মহামারি বিশ্ব জুড়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে তার বহুমুখী প্রভাব দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়েও। তা ওঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেমিট্যান্স পাঠানোর সর্বশেষ হিসাবে। বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ৭ লাখ কর্মী দেশে ফিরেছেন। আর কয়েক লাখ কর্মী দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। করোনাকালে মোট কত জন কর্মী দেশে ফিরবেন তার কোনো সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। করোনার কারণে প্রবাস থেকে ইতিমধ্যে যে কর্মীরা ফেরত এসেছেন এবং যারা ফেরত আসবে, তাদের সহায়তার জন্য সরকার সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঐ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে একটি ঋণ সুবিধা চালু করা হবে।

বিদেশফেরত প্রবাসীরা যাতে দেশেই ছোটোখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য করে চলতে পারেন তার জন্য এই ঋণ সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন বিদেশফেরত কর্মীরা। সরকার ঘোষিত ২০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রবাসফেরত কর্মীরা এই সুবিধা পাবেন। কেবল করোনাকালে যারা দেশে ফিরেছেন তারাই ঋণ সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন।