করোনাকে আটকাইতে বাংলাদেশে সরকারি ছুটি শুরু হইয়াছিল ২৬ মার্চ হইতে। অতঃপর দফায় দফায় ছুটি বাড়ানো হইয়াছে। আরো কতদিন ছুটি চলিবে, তাহা কেহ জানে না। ইতিমধ্যে সাধারণ ছুটির ৪৪ দিন পার হইয়া গিয়াছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হইয়াছে ১৩ সহস্রাধিক এবং মারা গিয়াছে দুই শতাধিক। আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ইহা সরকারি হিসাব। প্রকৃত চিত্র আরো খারাপ বলিয়া মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন যেইভাবে বাড়িতেছে, তাহাতে আগামী কয়েক দিন পর হইতে এই সংখ্যা দিনপ্রতি হাজার ছুঁইতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে জানাইয়াছেন, করোনার পিক অবস্থা এখনো আসে নাই। আগামী জুন-জুলাই করোনার চূড়ান্ত সুনামি বহিয়া যাইতে পারে বাংলাদেশ জুড়িয়া। ভারতের বিশেষজ্ঞরাও আশঙ্কা করিতেছেন, টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাও সমান তালে বাড়িতেছে। ইহার ফলে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এমস)-এর ডিরেক্টর বলিয়াছেন, দেশটিতে জুন-জুলাইয়ে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাইবে।
আসলে জীবন না থাকিলে যেমন জীবিকার প্রশ্ন উঠে না, তেমনি জীবিকাহীন জীবনও অর্থহীন। সুতরাং জীবন ও জীবিকা উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়া রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়াছে সারা বিশ্ব। বিশেষ করিয়া এই উপমহাদেশ, ‘যেইখানে দিন আনি দিন খাই’ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। কেহ কেহ মনে করেন, লকডাউন বহুলাংশে বৃথা গিয়াছে। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই যে লকডাউনের মাধ্যমে এই রোগের সংক্রমণ বিস্তারণ বহুলাংশে আটকানো সম্ভব এবং বিশ্বের বহু দেশেই সেই লক্ষ্যে লকডাউন জারি করা হইয়াছে। কিন্তু উপমহাদেশে যেই বিপুল পরিমাণে সাধারণ শ্রমিকশ্রেণি রহিয়াছে, তাহাতে এই অঞ্চলে কঠোরভাবে দিনের পর দিন লকডাউন চালাইয়া যাওয়া অসম্ভব বটে। এইখানে প্রশ্ন আসিয়াছে জীবন ও জীবিকার। জীবন বাঁচাইতে লকডাউন আবার লকডাউনের কারণেই জীবিকায় কোপ পড়িয়াছে। তাহাতে না খাইয়া মরিবার আশঙ্কা প্রকট হইতেছে। করোনার কারণে সারা বিশ্বেই পদধ্বনি শোনা যাইতেছে স্বল্পকালীন দুর্ভিক্ষের। যেই কারণে বাংলাদেশে শপিংমলসহ অনেক কিছুই খুলিয়া দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। পাকিস্তান লকডাউন শিথিল করিয়াছে। ভারত ভাগ করিয়াছে রেড অরেঞ্জ ও গ্রিন জোনে এবং রেড জোনেও অনেক কিছুই নিয়ম মানিয়া খুলিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত লইয়াছে।
মানুষের জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাহার বাঁচিয়া থাকিবার জন্য ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সারা বিশ্বই অসহায়। আশঙ্কা করা হইতেছে, কাজ হারাইবেন বিশ্বের প্রায় ২০০ হইতে ৩০০ কোটি মানুষ। তাহা ছাড়া করোনার প্রকোপ চলিতে পারে আরো দুই বত্সরাধিক কাল। ততদিন অবধি সামাজিক দূরত্ব মানিয়া চলিবার পরামর্শ দেওয়া হইতেছে। সুতরাং ভবিষ্যত্ কর্মজগতে অনেক নিয়মকানুনই পালটাইয়া যাইবে। করোনাকে সামলানোর পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার এমন জটিল সমীকরণ আগে কখনো দেখা যায় নাই। এই সমীকরণ মিলানোই এখন বিশ্বের নিকট সবচাইতে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
