চিররঞ্জন সরকার
সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়ছে বাংলাদেশ।
ইউএনডিপির এই প্রতিবেদনটি দেখার পর থেকেই মনের মধ্যে একটা খচখচানি চলছিল। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে হোক আর অন্য যেকোনো বিষয়েই হোক, বাংলাদেশ ‘পিছিয়ে’ রয়েছে, এটা মানতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। কারণ কোনো কিছুতেই আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না। আমরা পিছিয়ে থাকার মতো জাতি নই। আমরা হলাম গিয়ে এগিয়ে থাকার জাতি। আসলে আমাদের স্টাইলটা অনেকে বুঝতে পারে না। তাই ভুল বোঝে, উলটো কথা লেখে। সত্যি কথা হলো, করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের অন্য কোনো দেশ আমাদের ধারেকাছেও নেই। এ ব্যাপারে আমরা অনন্য, অসাধারণ। আমরা করোনা মোকাবিলার নামে দেশে যে রকম একটা হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছি, সেটি আর কোনো দেশ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যে করোনা নিয়ে এত উলটাপালটা কথা বলেন, তার পরও তিনি আমাদের কর্তাব্যক্তিদের হারাতে পারবেন বলে মনে হয় না।
একবার চিন্তা করুন আমাদের করোনা মোকাবিলার আশ্চর্য রণনীতির কথা! অন্য কোনো দেশ যা করার কথা ভাবতেও পারবে না, আমরা সেটাই করছি। দেশে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্য যতই বাড়ছে, ততই আমাদের ‘ঘরে থাকা’র নীতি শিথিল হচ্ছে। রাস্তাঘাটে বাড়ছে জনসমাগম। ‘সীমিত পরিসরে’ একে একে কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজারঘাট, উপাসনালয় সবই খুলে দেওয়া হচ্ছে। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার রাস্তাগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে। এদিকে গণমাধ্যমে এখনো নিষ্ঠার সঙ্গে প্রচার করে যাচ্ছে—‘ঘরে থাকুন’, ‘জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হবেন না।’ এমন সাহসী সিদ্ধান্ত আর কোনো জাতি নিতে পারে?
আমাদের হিম্মত আছে। তাইতো আমরা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কোনো পরিকল্পিত বা সমন্বিত উদ্যোগের কথা চিন্তা করিনি। বরং আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে একের পর এক স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নির্দেশনা দিয়েছি। এই সমস্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা সমালোচিত হচ্ছে এবং অনেক কাজই লেজেগোবরে হয়ে যাচ্ছে। তাতে কী? আমরা তার পরও বীরবিক্রমে সমন্বয়হীনতা ও অস্থিরতাকে পাথেয় করে এগিয়ে চলেছি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে। আমাদের লক্ষ্য কী? কোনো লাগসই পরিকল্পনা ছাড়াই যেনতেনভাবে করোনাকে পরাস্ত করা। করোনার বিরুদ্ধে মানবঢালকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
করোনা মোকাবিলায় যেসব দেশ সফল হয়েছে, তাদের প্রধান প্রতিষেধক ছিল লকডাউন। বাংলাদেশেও লকডাউন হয়েছে। তবে সেটা হয়েছে সম্পূর্ণ দেশীয় কায়দায়, আমাদের নিজস্ব নিয়মে। পর্দার নামে রমজান মাসে ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলোতে যেমন একটা পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, কিন্তু খদ্দেরদের পা থেকে কোমর পর্যন্ত ঠিকই দেখা যায়, আমাদের লকডাউনও হয়েছে ঠিক তেমন। এই লকডাউনে কিছু মানুষ বিনা কারণেই বাইরে বের হয়েছে। বেড়িয়েছে, চা খেয়েছে, আড্ডা দিয়েছে, মনের সুখে বাজার করেছে, কেউ কেউ বিয়েও করেছে। লকডাউনের মধ্যে অফিস কিংবা কারখানার বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে কাজ পরিচালনার ঘটনাও একেবারে কম ঘটেনি। কেবল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো লকডাউন মেনে চলেছে কার্যকরভাবে। এটা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি করতে পারবে? আছে কারো এমন দুঃসাহস? তাহলে আমরা পিছিয়ে থাকলাম কীভাবে?
আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল ইউনিক, ব্যতিক্রমধর্মী। করোনার দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, কিন্তু তাদের কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। তারা মাঝেমধ্যে তেল পুড়িয়ে ধুলা উড়িয়ে গাড়িতে করে চক্কর দিয়েছে। লাঠি-গুলি-টিয়ারগ্যাস কোনো কিছুই ব্যবহার করেনি। তার দরকারও হয়নি।
আমাদের মানুষগুলোও কত্ত কিউট। যে যেটা খায়, যে যেটা করে, সেটা তারা করোনার কারণে ত্যাগ করেনি। এই চরম সংকটের সময়েও কিছু মানুষ তাদের স্বভাব অনুযায়ী চুরি-চামারি অব্যাহত রেখেছে। ‘সুযোগ বারবার আসে না’—এই আপ্তবাক্য মনে রেখে অনেকেই অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ত্রাণ চুরি করেছে। অনেক নিষোধাজ্ঞার পরও আমাদের দেশের অনেক মানুষ লুকিয়ে-ছাপিয়ে হলেও উপাসনালয়ে গেছে। করোনার কারণে ধর্মাচারকে বিসর্জন দেয়নি।
আমরা অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল। আমরা জানি যে আচ্ছাদন দিয়ে, পিপিই দিয়ে এই অতি ক্ষুদ্র বদমাশ ভাইরাসকে রোখা যাবে না। তাইতো আমরা অনেক সমালোচনার পরও সব ডাক্তার-নার্সকে সুরক্ষাসামগ্রী দিইনি। খামোখা অপচয় করে কী লাভ? টাকার দাম আছে না? উদারতার দিক থেকেও আমরা কম যাইনি। যেসব দুর্নীতিবাজ সাধারণ মাস্ককে এন-৯৫ হিসেবে সরবরাহ করেছে, মানসম্মত সুরক্ষাসামগ্রী না দিয়ে নিম্নমানের জিনিস গছিয়ে এই আকালের বাজারে কিছু টাকাপয়সা কামাই করেছে, আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তারা তো ইচ্ছা করে এমন কাজ করেনি। যা করেছে, পেটের জন্যই করেছে। পেটের দায়ে মানুষ কি না করে?
আমাদের সরকার বাহাদুর করোনাকে শিক্ষা দিতে কৌশল কিছু কম নেয়নি। সরকার ‘আজ আমাদের ছুটি রে ভাই আজ আমাদের ছুটি’ গান না গেয়েও একের পর এক ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে যাচ্ছে। ওদিকে গার্মেন্টস খুলে দিয়েছে। ফলে সারাদেশের শ্রমিকেরা হুড়মুড় করে ঢাকায় এসেছে। সামাজিক দূরত্বের নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাদাগাদি করে তারা লড়ি, লঞ্চ, ট্রাক বা ফেরিতে যে যেভাবে পেরেছে ঢাকায় এসেছে। এভাবে সাধারণ ছুটিটাকে একটি হাস্যকর প্রহসনে পরিণত করে করোনাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, করোনাকে বিভ্রান্ত করতে সরকার একদিকে ১৮টি মন্ত্রণালয় খোলা রাখার নির্দেশ জারি করেছে। আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর তাদের কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে কাজ ছাড়া অফিসে আসবেন না। ফলে ঐ ১৮টি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও করোনা একটি ভ্রমের মধ্যে পড়েছে যে, তাদের কি আসলে ছুটি নাকি তারা অফিসে যাবেন! এমন অভিনব কৌশল গ্রহণের সামর্থ্য আর কোনো দেশের কর্তাব্যক্তিদের আছে কি?
যারা বলে আমাদের দেশ সবকিছুতে পিছিয়ে পড়া, তারা আসলে ঠিক বলে না। যারা বলে আমাদের দেশ অনেক কিছুতে কম, তারাও ঠিক বলে না। আমাদের দেশ অনেক কিছুতেই বেশি। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। গৃহহীনের সংখ্যা অনেক। বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর সংখ্যা মোটেও কম নয়। মাত্র এক বেলা খেতে পান এমন মানুষ প্রচুর। কর্মহীনের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কলকারখানা বন্ধ হওয়ার সংখ্যা রোজই নিজেই নিজের রেকর্ড ভাঙছে। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের দুর্দশার ক্ষেত্রেও আমাদের দেশ অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বেচে দেওয়ায় আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছি। জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোয় আমাদের পারফরম্যান্স দুরন্ত। করোনার শুরুতে মাস্ক-স্যানিটাইজারের দাম বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আমরা নিজেদের অবস্থানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছি। মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়ায় আমাদের রেখাচিত্র সর্বদা ঊর্ধ্বমুখী। প্রবীণদের সঞ্চয়ে কোপ বসানোর ঘটনায় আমাদের কেউ টপকাতে পারবে না। ব্যাংকের আর স্বল্প সঞ্চয়ের সুদ কমানোয় আমরা নিশ্চয় বিশ্বে প্রথম। ধর্মীয় মেরুকরণেও আমাদের ধারেকাছে কেউ আসতে পারবে বলে মনে হয় না। অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও আমরাই ফাস্ট। নিজেদের করোনা উপসর্গ লুকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও সম্ভবত এক নম্বর। করোনা রোগীকে ঘৃণা করার ক্ষেত্রে, তাদের প্রতি নির্দয় হওয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের কেউ টপকাতে পারবে বলে মনে হয় না। বেশির তালিকা আরো বড়ো করা যায়। তবে এইটুকুই কি যথেষ্ট নয়? তাহলে কে বলে আমরা পিছিয়ে? সবচেয়ে কম করোনা টেস্ট করা, করোনা রোগীর সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা গরমিল করা, এখানেও আমরা পিছিয়ে নেই। তাহলে ইউএনডিপি কী করে বলে যে আমরা পিছিয়ে?
পুনশ্চ : করোনাকালে ফেসবুকের পাতায় নানা ধরনের গল্প ঘুরে বেড়াচ্ছে। তেমনই একটি গল্প :প্রতিবেশী করিমকে রহিম বলল, মিয়া তোমার গরু বেঁধে রাখো। করিম গরু ঠিকই বাঁধল, তবে রশি দিল লম্বা। তো যা হওয়ার তাই হলো, আবার খেত নষ্ট। রহিম এইবার বলল, করিম মিয়া গরুর রশি খাটো করো। করিম রশি খাটো করল ঠিকই, সঙ্গে খুঁটা দিল এগিয়ে। রহিম এবার খুবই ক্ষিপ্ত হলো, উত্তেজিত হয়ে বলল, ঐ মিয়া, তুমি রশিও খাটো করো আবার খুঁটাও দূরে সরাও। তো করিম এইবার খুটা একবারে দূরে সরিয়ে রেখে, রশি খাটো করে গরু দিল বেড়ার সঙ্গে বেঁধে। এইবার তো রহিমের মাথা পুরোই নষ্ট। করিমকে গিয়ে বলল, ভাইরে! তোর কাছে মাফ চাই। তুই তোর গরু ছাইড়াই রাখ, ছাইড়া রাখলে তোর গরু আমার খেতে কমই আসে, অন্যদিকেও যায়।
তো আমাদের লকডাউনের অবস্থাও অনেকটা এই রকম। মানুষ তো ঘরে থাকেই না, উলটো বসে বসে ত্রাণ খাচ্ছে। মাঝখান দিয়ে কাজকর্ম সব বন্ধ, অর্থনীতি লাটে, সরকারের ঘুম হারাম। এই লকডাউন তাই খুলে দেওয়াই ভালো, যারা বাঁচার বাঁচবে, আর যেগুলো বিদায় নেওয়ার নেবে।
বিনা কাজে মরার চেয়ে মানুষ মরে তো কাজ করে মরুক!
n লেখক :রম্যরচয়িতা
