গোপাল নাথ বাবুল
লঙ্কায় রাম-বাবণের যুদ্ধে স্বামী মেঘনাদের মৃত্যুতে কাতর প্রমীলা তার সখি বাসন্তীকে বলল, এ ফুলমালা কার চরণে দেব? চল সখি, লঙ্কাপুরে গিয়ে দেখি, এমন কার সাহস, দানবরাজের প্রাণ হরণ করে? উত্তরে সখি যখন বলল, কীভাবে লঙ্কাপুরে যাবে? চারিদিকে লাখ লাখ শত্রু লঙ্কা ঘিরে রেখেছে। শুনে বজ্রের মতো গর্জে উঠে প্রমীলা বলল, কী বললে সখি? দানব নন্দিনী আমি, রক্ষ-কুল-বধ;/রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,/আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে? বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর বিখ্যাত ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের তৃতীয় সর্গে এভাবে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকা রমণী, তেজস্বিনী, স্বাধিকারচেতনা ও ব্যক্তিত্বশীলা নারী হিসেবে মেঘনাদের স্ত্রী প্রমিলাকে উপস্থাপন করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত রাঘবই রাক্ষসকুলকে ধ্বংস করে লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধার করেছে।
আমাদের অবস্থাও প্রমীলার মতো হয়েছে। সারা বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের প্রকোপে নিঃস্ব হওয়ার পথে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। করোনা ভাইরাস বর্তমানে বাংলাদেশে চতুর্থ ধাপে অবস্থান করছে। যত বেশি করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তত বেশি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরীক্ষা কম হওয়ার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিশে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়া এলাকায় ঘোরাফেরা করছে। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ হাজার করোনা পরীক্ষা করার জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মে মাস খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যদি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী লকডাউন মানা না হয়, তাহলে এ মাসে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে করোনা সংক্রমণ—যা ঠেকানো প্রায় অসম্ভবও হতে পারে। আবার আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কেউ লকডাউন মানছে না। প্রশাসন শত চেষ্টা করেও জনগণকে ঘরে ফেরাতে পারছে না। যে কোনো উসিলায় তারা বের হয়ে পড়ছে। অথচ কঠোরভাবে লকডাউন, কোয়ারেনটাইন ও আইসোলেশন মেনে চলায় চীনের পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ভিয়েতনামে আক্রান্ত হলেও এখনো পর্যন্ত একজন মানুষও মারা যায়নি। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়নে হোমকোয়ারেনটাইন নয়, ভিয়েতনামের মতো সরকারি কোয়ারেনটাইন হোক। তাছাড়া করোনা পরীক্ষা ব্যাপকভাবে না করলে, চিকিত্সকদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম না দিলে এবং প্রমীলার মতো যদি ভাবি, করোনাকে ভয় করি না, তাহলে রাঘবের মতো করোনা হয়তো আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারে এবং ধীরে ধীরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সুতরাং ঘরে থাকুন। নিজে সুরক্ষিত থাকলে নিজের পরিবার, নিজের এলাকা ও দেশও সুরক্ষিত থাকবে।
চট্টগ্রাম
