সংসারের মায়াজালে মানব মনের সংকট

আপডেট : ০৮ মে ২০২০, ২২:০৮

মো. আবদুল্লাহ আল মামুন

বিখ্যাত লিবানিজ কবি, লেখক ও শিল্পী কাহলিল জিবরান মানুষের ভালো-মন্দ বিষয়ে একটি কথা বলেছেন—‘তোমরা অসংখ্য দিক দিয়ে ভালো, আর যখন তোমরা ভালো নও তখনো কিন্তু মন্দ নও। তোমরা তখন শুধু উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করো এবং আলস্যকে প্রশ্রয় দাও।’ আসলে আমরা মানুষ আমাদের আসল উদ্দেশ্যকে ভুলে আলস্যকে প্রশ্রয় দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে এক অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছি।

সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় আমরা কোনো মায়ের গর্ভ থেকে এই পৃথিবীতে এসেছি। তারপর সন্তান, পিতা, ভ্রাতা, স্বামী বা অন্য কোনো সম্পর্কে জীবন পার করছি। আমাদের উদ্দেশ্যহীন চাওয়াগুলো এই সম্পর্কগুলোকেও মাঝে মাঝে দিকভ্রান্ত করে।

একজন পিতা তাঁর সকল ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়াগুলোকে মনে পুষে রেখে সন্তানের স্বপ্ন পূরণে নিজের সর্বস্ব বাজি রাখেন। বিনিময়ে তিনি হয়তো প্রত্যাশা করেন জীবনের শেষবেলায় একটু আশ্রয় আর একটু সম্মান। কিন্তু বেলাশেষে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই যদিও হয়, সন্তানের তেতো কথা তাঁর আর সয় না। অথচ এই সন্তানই যখন পিতার ভূমিকাই অবতীর্ণ হয় সেও তার সন্তানের কাছে কতকিছুই প্রত্যাশা করে, যার সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে মনোক্ষুন্ন হয়। তাকে আদর্শ সন্তান ভাবতে তার কষ্ট হয়। যে সন্তানই কি না একদন তার পিতার প্রতি দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয়েছিল।

একজন মা যে দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন কত কষ্ট করে একটি সন্তানকে তাঁর গর্ভে ধারণ করেন, তিনি জানেন কতটুকু কষ্টের ফসল একটি সন্তান। অথচ সে মাও একদিন ভুলে যায় যে সে একজন মা। যখন অন্য একটি মায়ের সন্তান তাঁর সান্নিধ্যে আসে, তার কোনো কাজই তাঁর মনে ধরে না। সে তাঁর কাছে হয়ে ওঠে অলক্ষ্মী। নিজের সন্তানের মতো তাকে আপন ভাবতে পারে না। একজন মা যদি তাঁর সন্তানকে পথের মাঝে ফেলে চলে যেতে পারেন, পৃথিবীর সকল মায়ের সন্তানকে তাঁর আপন সন্তান মনে করতে না পারেন— তাহলে সে মাতৃত্বের অংহমবোধ হ্রাস পায় নিশ্চয়।

এবার দেবালয় থেকে বাইরে যাওয়া যাক—ধরুন অফিসের বড়ো কর্তা যিনি গৃহ থেকে শুরু করে অফিসের অধস্তন পর্যন্ত সবার প্রতি নীতিকথার বজ্রনাদ ছুড়তে থাকেন। সবকিছুতে প্রমাণ করতে চান যে তিনি একজন আদর্শবান ব্যক্তিত্ব। অথচ খবর নিলে জানা যাবে, তিনি ঠিকমতো কখনো অফিসেই যান না! ছাত্র শিক্ষককে দেখে সশ্রদ্ধভীত না হয়ে উলটো শিক্ষক ছাত্রদের ভয়ে কাঁপছেন! গরিবের চাল, গম চুরি করা ব্যক্তিগুলো আবার হাল ধরে আছেন উপসনালয়ের! বিদ্যাপীঠগুলো মনের খোরাক না মিটিয়ে পেটের খোরাকের সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। তাহলে বলাই যায় আমরা উদ্দেশ্যহীন পথে হারিয়ে গিয়েছি। তবে হ্যাঁ হালভাঙা একটা জাহাজ যেমন উদ্দেশ্যহীনভাবেও বিপদজ্জনক দ্বীপসমূহের মধ্য দিয়ে ঘুরতে পারে, তবুও সাগরের অতলে ডুবে যায় না; তেমনি আমাদের হালটা ভেঙে গিয়েছে সত্য, কিন্তু এখনো আমরা পারি নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এমন একজন পিতা হতে যে নিজেকে শুধু একজন পিতা হিসেবে না— একজন সন্তান হিসেবেও ভাবতে পারে। এমনি একজন মা পৃথিবীর সকল সন্তানকে তার নিজের সন্তান ভাবতে পারে। আমরা হতে পারি এমন একজন শিক্ষক যে তাঁর জ্ঞানের ভবনে প্রবেশের নির্দেশ দেন না, বরং আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান।

একজন প্রত্যয়মণ্ডিত মানুষ এমন একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে কাজ করে যা নিরানব্বই জন স্বার্থপ্রণোদিত মানুষের সমান। তাই নিছক একজন ব্যক্তি হিসেবে শুধু নিজের জন্য বেঁচে না থেকে অন্যের জন্য, এই দেশমাতৃকার জন্য আমাদের জীবনটাকে পরিচালিত করা উচিত। কারণ একজন পরিতুষ্ট শূকরছানা হওয়ার চেয়ে অপরিতুষ্ট মানব সন্তান হওয়াই শ্রেয়।

রাজশাহী