স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি যেভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল

আপডেট : ০৮ মে ২০২০, ২২:৫৭

২০২০ সালে সারা বিশ্বের মানুষের উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা আর আতঙ্কে পরিণত হয়েছে করোনা ভাইরাস। আজ থেকে ১০০ বছর আগেও বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছিল মহামারি ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। প্রায় ১০০ বছর পরে আবারও বিশ্বব্যাপী মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই স্প্যানিশ ফ্লু এবং করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে কিছু মিল-অমিল বের করার চেষ্টা করছেন। যদিও করোনা ভাইরাস এবং স্প্যানিশ ফ্লুর মধ্যে কোনো মিলই নেই। তখনকার দিনে স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সেই সময়ে স্প্যানিশ ফ্লুতে সারা বিশ্বে অন্তত ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। করোনা ভাইরাসে বয়স্কদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকলেও স্প্যানিশ ফ্লুতে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি ছিল।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা ঠিক করতে স্প্যানিশ ফ্লু সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা করে ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড। গবেষণায় উঠে আসে—১৯১৮ সালের শরত্কালে রোগটি দ্বিতীয় ধাপে ছড়িয়ে পড়লে তা প্রথম দফার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নেয়। ১৯১৮ সালের মে মাসে যখন প্রথম রোগী শনাক্ত হয়, যুক্তরাজ্য তখনো প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িত ছিল। অন্য অনেক দেশের সরকারের মতো যুক্তরাজ্যের সরকারও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিল যে যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না রোগকে। ধারণা করা হয়, যুদ্ধ সংক্রান্ত কার্যক্রমকেই ঐ সময় অগ্রাধিকার দিয়েছিল তারা।

১৯১৯ সালে রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসিনের জন্য স্যার আর্থার নিউজহোমের করা এক প্রতিবেদনে উঠে আসে যে সে সময় গণপরিবহন, সৈনিক বহনকারী পরিবহন এবং যুদ্ধ উপকরণ তৈরির কারখানার মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ। ঐ রিপোর্ট প্রকাশের এক বছর আগে, ১৯১৮ সালের জুলাইয়ে, স্যার আর্থার নিউজহোম এক ‘গণবিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন; যেখানে মানুষকে ঘরে থাকতে এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলতে নির্দেশ দেওয়ার কথা ছিল। স্যার আর্থার মনে করতেন, নিয়ম মেনে সে সময় বহু প্রাণ বাঁচানো যেত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন: ‘অনেক সময় জাতীয় পরিস্থিতি এমন হয় যে তখনকার প্রধান দায়িত্ব হয় ‘চালিয়ে যাওয়া’ এমনকি স্বাস্থ্য এবং জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লেও।

ঐ সময় সংক্রমণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো ধরনের লকডাউন জারি করা হয়নি। তবে অনেক থিয়েটার, নাচের হল, সিনেমা হল এবং গির্জা             বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডের ফুটবল লিগ এবং এফএ কাপ যুদ্ধের জন্য আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে মহামারির কোনো প্রভাব খেলার ওপর পড়েনি। কিছু কিছু শহরে জীবাণুনাশক ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং কিছু মানুষ জীবাণুবিরোধী মাস্ক পরতেন। তবে এই সময়ে সবাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করে গেছে। কাশি এবং হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর বিষয়ে সতর্কতা জানানো হয়েছিল প্রজ্ঞাপন ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে।

১৯১৮ সালের মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এমন দেশ নেই। তবে মহামারির প্রাদুর্ভাব ও তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় বিভিন্ন দেশের সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো রাজ্য তাদের নাগরিকদের কোয়ারেন্টাইন করার নির্দেশ দেয়। কোনো কোনো রাজ্য মুখে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করে। পুরো দেশেই সিনেমা হল, থিয়েটার এবং মনোরঞ্জনের স্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়। —বিবিসি