চলমান কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এ অবস্থায় জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করার সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গতকাল শনিবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যক্তিশ্রেনীর করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করে সিপিডি। পাশাপাশি তিনটি স্তরে করহার ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমাতে সুপারিশ করা হয়। করফাঁকি, অর্থপাচার বন্ধ এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বক্তব্য রাখেন। এতে মূল প্রস্তাবনা তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ্য গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। সিপিডির বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হয়, করোনা সংক্রমণের সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূণ স্বাস্থ্যখাত। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্যখাতে অনেক কম বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) কমপক্ষে দুই শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। এটি বর্তমানে এক শতাংশের কম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অনুত্পাদনশীল খাতে সরকারের ৫০ শতাংশ ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রমে ও সরকারি পরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো স্বচ্ছতা আনয়নের মাধ্যমে সরকারের সাশ্রয়ী ও ব্যয় সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। ভারতেও ৬০ শতাংশ প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে আনতে বলা হয়েছে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতকে অত্যন্ত সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি প্রনোদনা কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনিতেই ব্যাংকে তারল্য সংকট রয়েছে, তারওপর এই প্রণোদনা বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যাংকে ঋণের চাপ বেড়ে যাবে। খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংক অনেক দুর্বল। অনেক প্রভাবশালীরা ইচ্ছা করে খেলাপি হয়েছেন। এখানে প্রণোদনা কাকে দেওয়া হবে এটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী এবং কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তিরাও প্রণোদনার সুবিধা চাইতে আসবেন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে যাচাই-বাছাই করে এই কাজ করতে হবে। বাজেট প্রস্তাবনায় ব্যক্তি শ্রেনীর করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানে আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ করতে হবে। করোনা পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এ সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি নিচের ৩টি স্তরের করহার কমাতে হবে। সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ, ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ, এবং ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করতে হবে। এছাড়া চলতি বছরের যাতে কর আগামী মার্চ পর্যন্ত দেওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এসএমই শিল্পখাতে বার্ষিক করমুক্ত টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করতে হবে। পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে অগ্রিম আয়কর এবং ভ্যাট কমাতে হবে। ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, বড় শিল্পের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই মুহুর্তে তাদের কর্পোরেট ট্যাক্স অপরিবর্তিত রাখা যেতে পারে। জিডিপিতে রাজস্বের পরিমান অনেক কম। এটি বাড়াতে করজাল বাড়িয়ে করফাঁকি রোধ করতে হবে। প্রতিবছর বিপুল পরিমান অর্থ পাচারের পথ বন্ধ করতে হবে। আর অবৈধ টাকা (কালো) বৈধ (সাদা) করার সুযোগ রাখা ঠিক হবে না।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের বৈদেশিক খাত চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। রপ্তানি- রেমিটেন্স অনেক কমে যাচ্ছে। আগামীতেও কমবে। আমাদানি কম থাকায় রিজার্ভে এখনও চাপ পড়ছে না। তবে ভবিষ্যতে চাপ বাড়বে। এখন বৈদেশিক সাহায্য যেন পাওয়া যায় সেই বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিখাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর সরকারের জোর দেওয়া উচিত।
শপিংমল খুলতে ৯৩
শতাংশের না: অনলাইন জরিপ
করোনা পরিস্থিতিতে ঈদের আগে শপিংমল খোলার বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৯৩ শতাংশ উত্তরদাতা। আর শপিংমল খুললে না যাওয়ার কথা জানিয়েছেন ৯৬ শতাংশ। সিপিডির এক অনালইন জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বাজেট প্রস্তাবনার সাথে সাথে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, জরিপে উত্তর দিয়েছেন ২২৬৪ জন। এদের মধ্য ২১০০ জন ‘না’ ভোট দিয়েছেন। সেটা প্রায় ৯৩ শতাংশ। সুতরাং, আমরা দেখছি অধিকাংশ শপিংমল না খোলার পক্ষে মত দিয়েছেন।
