আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে মারা গেলেন অতিরিক্ত সচিব

আপডেট : ০৯ মে ২০২০, ২৩:১১

আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে কিডনির জটিলতায় অসুস্থ অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার মারা গেছেন। করোনা ভাইরাস সংকটের এই সময়ে একের পর এক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিত্সা মেলেনি। অন্য কোনো হাসপাতালে না পেরে শেষে বৃহস্পতিবার কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

গৌতম আইচের মেয়ে চিকিত্সক সুস্মিতা আইচ বলেন, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে গৌতম আইচের মৃত্যু হয়।  কোভিড-১৯ এর কোনো উপসর্গ না থাকলেও অন্য কোনো উপায় না পেয়ে অনেক কষ্টে বাবাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করাই। বাবার আইসিইউ সাপোর্টটা খুব দরকার                 ছিল, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি। বাবার চিকিত্সাই হলো না, তিনি মারা গেলেন। আমি ডাক্তার হয়েও কিছু করতে পারলাম না। যে ৩৩৩ হটলাইন নম্বর থেকে সরকার স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে, সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সুম্মিতা। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও তার বাবা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত কি না, তা জানার চেষ্টাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করেননি।’

সুস্মিতা বলেন, ‘বাবার ডায়ালাইসিসের সময় প্রায়ই হঠাত্ করে প্রেসার বেড়ে যেত, শ্বাসকষ্ট হতো, ফুসফুসে পানি চলে আসত। আইসিইউ সাপোর্ট হলে ঠিকও হয়ে যেত। গত বৃহস্পতিবার ল্যাবএইড হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের সময় তার প্রেসার বাড়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট শুরু হলে ল্যাবএইডের ইমার্জেন্সি থেকে চিকিত্সক মেয়ে সুস্মিতাকে ফোন করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি বাবাকে ল্যাবএইডে ভর্তি করাতে বলি। তখন তারা বলে, ‘ সুযোগ না থাকায় ল্যাবএইডে তারা আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবে না। তাই প্রেসার কমানোর ওষুধ দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলে। আমার কাছে মনে হয়েছে বাসায় আনা ঠিক হবে না, এই মুহূর্তে অক্সিজেন দরকার। বিকাল ৪টায় ডায়ালাইসিস শেষ হয়, আমরা বাবাকে নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে যাই। আমি নিজে ডাক্তার পরিচয় নিয়ে সব কিছু বুঝিয়ে বললাম। করোনা সন্দেহে তখন তারা বলল, কোনো রেফারেন্স ছাড়া তারা ভর্তি নিতে পারবে না। কোভিড-১৯ টেস্ট করাতে চাইলে তারা আইইডিসিআরের কথা বলে। কিন্তু তারা আইইডিসিআর তো টেস্ট করানো বন্ধ করে দিয়েছে! পরে বাবাকে নিয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাই।’ সুস্মিতা বলেন, ‘তারাও টেস্ট করানোর কথা বলে স্কয়ারে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখান থেকে আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে নিয়ে আসি, কিন্তু তারা পেশেন্টকে দেখেনি, চেকও করেনি। তারা বলে, ভর্তি নিতে পারবে না। যেহেতু আমি এই হাসপাতালে কাজ করেছি, আমি অতিরিক্ত পরিচালকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি চেস্ট এক্সরে করিয়ে আনতে বলেন। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল বাবা স্ট্রোক করেছে। কারণ তার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর তিনি কোভিড-১৯ টেস্ট করানোর কথা বলেন। ওখানে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবে না বলে জানানোয় স্কয়ারে নিয়ে যাই। স্কয়ার থেকে বলা হয়, ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়, আমরা টেস্ট বন্ধ করে দিয়েছি। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালে যাই। তারা বলে, এই পেশেন্টকে কার্ডিয়াক সাপোর্ট দেওয়া দরকার, কিডনির পেশেন্ট। আমাদের এই সাপোর্ট শুরু হয়নি, আমরা পারব না। সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী কার্ডিয়াকে যাই। তারা রাখতে পারবে না বলে জানায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কথা বলি, তারাও বলে, এই মুহূর্তে ভর্তি নেওয়া সম্ভব না। আমি মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালেও গিয়েছি। আমাদের আশপাশে এমন কোনো হাসাপাতাল নেই যেখানে ভর্তি করানোর চেষ্টা করিনি। পরে সাড়ে ৯টার পর যখন আর কিছু করার ছিল না তখন আমরা বাসায় এসে বসে থাকি। এমন সময় এক আত্মীয় অনেক চেষ্টার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একটা ‘সিট ম্যানেজ’ হওয়ার খবর জানান।’

সুস্মিতা বলেন, ‘করোনার উপসর্গ না থাকলেও তাকে ওই হাসপাতালে নিয়ে যাই। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে বাবার অক্সিজেন ফল করতে শুরু করল। অথচ কোনো সরকারি ডাক্তার সেখানে যাননি। তারা আমাকে ওষুধ বুঝিয়ে দেন, আমিই ওষুধ খাওয়াচ্ছি, আমার ভাই অক্সিজেন দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, শুক্রবার করোনার পরীক্ষা করাবেন। কিন্তু শুক্রবার সারা দিন তারা টেস্টই করায়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর তারা বলছে, আগেই নমুনা নেওয়া দরকার ছিল। আমরা বললাম, এখন নিয়ে নেন। আমরা এখনো করাতে চাই।’