সৈয়দ আশরাফ উদ্দীন আহমেদ
শোনো, হাতিরঝিলের এমন ভিউ তুমি কই পাবা? তার ওপর এখান থেকে তোমার অফিস গুলশানে যেতেও সময় কম লাগবে, এই ফ্ল্যাটটাতেই আমি থাকতে চাই—বলল সোমা। অনেকটা বাধ্য হয়েই এই বাসাটা ভাড়া নিল নাফিজ। যেখানে, এখন তার অতীত-বর্তমান একই বিল্ডিং অবস্থান করছে, তিন তলা থেকে চার তলা ঘিরে।
রিমি চার তলা বাড়ির সবচেয়ে ওপরের তলায় একা থাকে। হালিমার মা সকালে এসে সব কাজ শেষ করে বিকেলে চলে যায়। বাবা-মায়ের অনেক জোরাজুরি করার পরেও দেশে থেকে যায়, একাকিত্বকে সঙ্গী করে। আচ্ছা সোমা, তুমি তো আমার অতীত জানো, মানে রিমির সঙ্গে আমার অতীত। এভাবে ওর সামনে আমাকে না নিয়ে এলেও হতো, মানে এই বাসা ভাড়া না নিয়ে আশেপাশে থাকলেও পারতাম, কিন্তু তোমার এই বাড়িই চাই!
মঙ্গলবার বিকেল, কলিংবেল বাজল, দরজা খুলতেই রিমি বাটি হাতে দাঁড়ানো।
—সরি, বাটিটা দিতে ভুলে গিয়েছিলাম আর ধন্যবাদ দারুণ পায়েসের জন্য।
—আরে ভেতরে এসো, চলো একসঙ্গে চা খাই। বলল সোমা।
—আসলে আমার একটু তাড়া ছিল...
—আরে এসো তো চা খেতে আর কতক্ষণইবা লাগবে।
ঠিক আছে, বলে রিমি ভেতরে ঢুকল। সোমা চা করে আনল।
দুজনে মিলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে আর টুকটাক কথা, কথার ছেদ ঘটল গাড়ির হর্নে। নাফিজ অফিস থেকে ফিরেছে, দারোয়ান গেট খুলছে আর বারান্দায় থেকে এটা দুজনেই দেখল। রিমি বলল, এবার আমি উঠি। উঠতে উঠতে বলল ছোট্ট একটা উপকার লাগবে, আমার বাসার চাবিটা হালিমার মা তোমার কাছে রেখে যাবে।
কলিংবেল বাজল, নাফিজ দরজা খুলে দেখল দারোয়ান গ্যাস সিলিনডার নিয়ে দাঁড়ানো। সোমা? চারতলার চাবি কি তোমার কাছে? চাবিটা চাচ্ছে দারোয়ান। সোমা দৌড়ে এসে দারোয়ানকে দিল আর বলল গ্যাস সিলিনডার নামিয়ে চাবি ফেরত দিয়ে যেতে। ঠিক আছে বলে, মাথা নাড়ল দারোয়ান।
ঘড়িতে তখন রাত সোয়া এগারোটা বাজে, অনেকটা ইতস্তত হয়ে কলিংবেল দিল রিমি। নাফিজ দরজা খুলল, এই নাও তোমার চাবি। দুজনের মধ্যে নীরব দৃষ্টি বিনিময়, নীরবতা ভাঙল সোমা, এসো রাতে এখানে খাবে, কারণ আমি জানি তোমার বাসায় রান্না হয়নি। অস্বস্তি এড়াতে মিথ্যার সাহায্য নিল রিমি, না বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। যদিও রিমির তখন খিদায় মাথা চক্কর দিচ্ছে।
ঘরে ঢুকেই রিমি গ্যাসের তীব্র গন্ধ পেল, কিচেনের জানালা বন্ধ। জানালা খুলতে যাবে তখন ফোন বাজল। হ্যালো, আমি জানি তুমি রাতের খাবার খাওনি, আর তোমার চেহারা দেখলে এখনো আমি বুঝি কোনটা সত্যি আর কোনটা অভিনয়।
এত রাতে নাফিজের ফোন পেয়ে অপ্রস্তুত রিমি এক কানে ফোন নিয়ে দেয়াশলাইয়ের কাঠির ঘষায় পুরানো স্মৃতির স্ফুলিঙ্গে হারাল। আর এদিকে, প্রচণ্ড শব্দের শব্দহীনতা ভেঙে ওপাশ থেকে কেউ একজন স্থির কণ্ঠে বলল—হ্যালো ফায়ার ব্রিগেড!
