সূর্য কি আর হাসিবে না?

আপডেট : ১০ মে ২০২০, ২১:১৪

করোনার কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর কত ধরনের অভিঘাত নামিয়া আসিতে পারে—এই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ সম্ভবত এখনো তাহা সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করিতে পারিতেছে না। করোনার অভিঘাতে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিয়াছে রোমান অক্ষর ‘এল’ প্যাটার্নে। আশঙ্কা করা হইতেছে, মন্দা চলিতে থাকিবে দীর্ঘদিন ধরিয়া। এমতাবস্থায় দেশের বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট অনেক এনজিও বেশ নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়িয়া যাইবে, তাহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি এনজিও পরিচালিত করিয়া থাকে। করোনার কারণে প্রতিটি দেশ এখন নিজের দিকে মনোযোগ দিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রেই যেমন গত কয়েক মাসে ২ কোটির অধিক মানুষ বেকার হইয়া গিয়াছে। পতনশীল অর্থনীতিকে টানিয়া তুলিতে প্রায় প্রতিটি ধনী দেশ ঘর সামলাইতে ব্যস্ত। আর তাহাতেই বহুলাংশে বিপদে পড়িতেছে বিশ্বব্যাপী পরিচালিত অসংখ্য এনজিও। বাংলাদেশের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ২৩ বত্সর ধরিয়া কাজ করিয়া আসিতেছে সূর্যের হাসি ক্লিনিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে বন্ধ হইতে যাইতেছে সূর্যের হাসির অসংখ্য ক্লিনিক।

সূর্যের হাসি ক্লিনিকগুলি হইতে দরিদ্র মানুষেরা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাইত। দেশের ৬৪ জেলাতেই তাহারা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসিতেছিল। এমনিতেই ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ একটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়িলেও বাংলাদেশে এখনো ৪৬.৭ শতাংশ মা গর্ভকালীন সেবা হইতে বঞ্চিত। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ইউএসএআইডি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে এনজিও হেলথ সার্ভিস ডেলিভারি প্রজেক্ট (এনএইচএসডিপি)-এর মাধ্যমে বৃহত্তম বিনিয়োগ করিয়াছিল। ইহার আওতায় ইউএসএআইডি বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়া আসিতেছিল। স্পষ্টতই ইহা একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। এই বিশাল নেটওয়ার্কের একটি অংশ হইতেছে সূর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক। স্বল্পমূল্যে মাতৃত্ব ও গর্ভকালীন সেবা, শিশু স্বাস্থ্য, বিনা মূল্যে টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, স্বল্পমূল্যে প্যাথলজি পরীক্ষা—এই সকল সেবা দেওয়া হইত সূর্যের হাসি ক্লিনিকে। দেশের মানুষ যখন করোনার ভয়াবহ ছোবল হইতে রক্ষা পাইতে নাজেহাল, সূর্যের হাসি নেটওয়ার্কে স্বাস্থ্যকর্মীরাও করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদর্থক ভূমিকা পালন করিতেছিলেন। এই অবস্থায় দেশের ১৫৮টি সূর্যের হাসি ক্লিনিক বন্ধ করিয়া দুই সহস্রাধিক কর্মীকে বাধ্যতামূলকভাবে চাকরিচ্যুত করিবার পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।

ইউনিসেফের তথ্যানুসারে বিশ্বের সর্বোচ্চ নবজাতক মৃত্যুকবলিত দেশগুলির একটি বাংলাদেশ। নির্ধারিত সময়ের চার বত্সর আগেই পাঁচ বত্সরের কম বয়সি শিশুর মৃত্যুহার হ্রাসের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন করিয়া ইতিমধ্যে উন্নয়ন আইকন হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছিল বাংলাদেশ। এই অর্জন সম্মিলিত বলা যায়। মনে রাখিতে হইবে, এখনো বাংলাদেশে নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি, প্রতি বত্সর জন্মের পর মারা যায় ৬২ হাজার নবজাতক। স্পষ্টতই, সূর্যের হাসির মতো ক্লিনিক বন্ধ হইয়া যাইবার সার্বিক ক্ষতি আরো অধিক। করোনার এই টালমাটাল বিশ্বে এইরকম আরো কত ধরনের ক্ষতি আমাদের মানিয়া লইতে হইবে, আমরা তাহা জানি না।