ড. মো. নাছিম আখতার
পৃথিবী নামের গ্রহে সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব মানুষ। বুদ্ধির গুণে আমরা সভ্যতাকে আজকের আধুনিক পর্যায়ে নিতে সক্ষম হয়েছি। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় প্রত্যেকটি ভৌত উপকরণ ও জীবনধারণে সকল উপাদানের কাঁচামাল মানুষ পায় প্রকৃতি থেকে। তাই সভ্যতার সুরক্ষায় চাই প্রকৃতি ও ভোগের সমন্বয় সমীকরণ।
প্রকৃতি ও ভোগের সমন্বয় সমীকরণ কি? মানুষ যা কিছু তৈরি করছে বা ব্যবহার করছে সেগুলোর কাঁচামালের মূল উত্স কিন্তু প্রকৃতি। আধুনিক যুগের মানুষ হয়ে পড়ছে আয়েশি এবং ভোগবাদী। অতীতে ধনী দেশগুলোর জনগণ শুধু ভোগ করত। এখন তথ্য-প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের কল্যাণে ধনী-দরিদ্র সব দেশে লেগেছে ভোগবাদী অর্থনীতির ছোঁয়া। মানুষের ভোগবাদী মনের এই দুষ্ট ক্ষুধার চাহিদা পূরণ করতে প্রকৃতি আজ ক্লান্ত ও বিপন্ন। কোনো সংসারে খরচ যদি আয়ের চেয়ে বেশি হয় তাহলে সেই সংসার দরিদ্র হয় এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ধ্বংস। বিশ্ব সংসারের সদস্যগণ তথা বিভিন্ন দেশ যদি সামগ্রিকভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারকে প্রাকৃতিকভাবে পুনরায় উত্পাদনের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না রাখতে পারে তাহলে নিঃশেষ হবে প্রকৃতি। তাই পৃথিবী রক্ষার সমীকরণটি হওয়া উচিত, ‘ভোগের সামগ্রী উত্পাদনের কাঁচামাল সংগ্রহের পরিমাণ সমান প্রাকৃতিক সম্পদের পুনঃ উত্পাদিত সম্পদের সামগ্রিক সমষ্টি’।
বর্তমান বিশ্বে ব্যবসা ও ভোগের খাতিরে মানুষ প্রতিনিয়ত বিপন্ন করছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। ১৭৬৫ সালে সূচিত হয় প্রথম শিল্পবিপ্লব। স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ওয়ার্ট তৈরি করেন স্টিম ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন দিয়ে মেশিন চালিয়ে শিল্পপণ্য উত্পাদন শুরু হয়। মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র যখন উত্পাদন শুরু করে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পড়তে থাকে মানবসৃষ্ট চাপ। প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করে প্রযুুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটিয়ে উত্পাদিত পণ্য কয়েকশ গুন বেশি দামে বিক্রি করে শিল্পোন্নত দেশগুলো ধনী থেকে ধনীতর হতে শুরু করে। তখন থেকেই মূলত মানুষের ভোগবাদী জীবন ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বয়হীনতার সূচনা। পরবর্তী ২৫৫ বছরে মানুষ প্রকৃতিকে করেছে রিক্ত। মানুষ প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে অত্যাধিক মাত্রায় সম্পদ আহরণের উপায় উদ্ভাবন করল, উদ্ভাবন করল পলিথিনের মতো বিষাক্ত প্রকৃতি ধ্বংসকারী ব্যবসাবান্ধব উপাদান যা এখন মানবসভ্যতার জন্য বিষফোড়া। পৃথিবীর ধমনী ও শিরা-উপশিরা খ্যাত সমুদ্র ও নদীর পানি আজ এই পলিথিনের দূষণে মারাত্মকভাবে দূষিত। সমুদ্রের সর্ববৃহত্ প্রাণী তিমি মাছের মৃত্যু ঘটছে এই পলিথিনের দূষণে। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর নদ-নদীর তলদেশ আজ পলিথিন বর্জ্যে এমনভাবে দূষিত যে, জলজ প্রাণীর বংশবিস্তার ও বসবাস প্রায় অসম্ভব। ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে জীবের খাদ্য শৃঙ্খল।
২০১৯ সালের আগস্ট মাসে গ্লোবাল ফুট প্রিন্ট নেটওয়ার্কের তথ্যানুযায়ী সারা বছর ধরে যে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা উচিত তা আমরা ব্যবহার করছি মাত্র আট মাসে। ফলে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে পৃথিবী। আজকের পৃথিবীর মানুষ যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছে তার যোগান দিতে কার্যত এক দশমিক সাতটি পৃথিবীর প্রয়োজন। স্যুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত সুইচ ফেডারেল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (ইটিএইচ জুরিখ) একটি গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, ১ লাখ কোটি গাছ লাগালে বাতাসে কমবে বিষ। আমাদের বায়ুমন্ডল হয়ে উঠবে ১০০ বছর আগের মতো। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু গাছ লাগালেই জীবন বাঁচবে।
জ্ঞানীজন বলেন, ‘সব সংকটের মধ্যে নিহিত থাকে সম্ভাবনার বীজ’। প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষ উদ্ভাবন করেছে কীভাবে এক দিনে স্বয়ংক্রিয় করাত দ্বারা হাজার হাজার গাছ কেটে ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি করা যায়, কীভাবে ডিনামাইট ও পারমাণবিক অস্ত্রের মাধ্যমে নিমেষে পৃথিবী ধ্বংস করা যায়। কিন্তু মানুষ মরু অঞ্চলকে শস্যশ্যামল ও বৃক্ষরাজিতে পূর্ণ করার প্রযুক্তি কি উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেছে! আসুন সচেতন হই। অন্যথায় সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রকৃতি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে তার হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনবে। নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই প্রকৃতিকে এমনই রূঢ় হতে হয়েছে যুগে যুগে কালে কালে।
n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭
