ঢাকায় সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল যেকোন নির্বাচনের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে সকালে সাড়ে ৮ টার দিকে ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারদের বেশি সমাগম দেখা গেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ভোটাররা তাদের ভোটারাধিকার প্রয়োগ করেছেন। মা-বাবা তাদের কোলের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে নির্ভয়ে ভোট দিতে এসেছেন। বয়স্করা লাঠি হাতে অন্যের সহায়তা নিয়ে ভোট দিয়েছেন ঢাকার ভোট কেন্দ্রগুলোতে। ঢাকার অনেক ভোটকেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টের দেখা মেলেনি। প্রিজাইডিং অফিসাররা বলেছেন, বিএনপির প্রার্থীরা পোলিং এজেন্ট দেননি। তবে সকল কেন্দ্রেই আওয়ামী লীগের সমর্থক ও পোলিং এজেন্ট দেখা গেছে। গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ইত্তেফাক এর প্রতিবেদকরা সরেজমিনে গিয়ে দেখেছে উত্সবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে রাজধানীর মিরপুর, কামরাঙ্গিরচর, যাত্রাবাড়ী এলাকায় কয়েকটি কেন্দ্রে গোলোযোগের খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য হতাহতের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
‘এতটা ভাল হবে কল্পনা করিনি’:সকালে ঢাকা ৭, ১০ ও ১৩ নম্বর সংসদীয় আসনে সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকেই এসব এলাকায় ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। ধানমন্ডি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘উত্সবমুখর পরিবেশে মানুষের স্বতর্ঃস্ফূত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভোট হচ্ছে। এতটা ভাল হবে সেটাই কল্পনা করিনি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে ভোট দিতে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারাকাত। তিনি বললেন, ‘খুব সুন্দর শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে।’
গতকাল ভোট চলাকালীন সময়ে এই তিন সংসদীয় এলাকায় ঘুরে একমাত্র হাজারিবাগ বালক উচ্চ বিদ্যালয় (মহিলা) কেন্দ্রে বিএনপির দুজন পোলিং এজেন্ট আসার কথা জানা গেছে। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের চিত্র দেখা গেছে ধানমন্ডি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র, সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজ কেন্দ্রে।
ঢাকা ১৩ সংসদীয় আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেয়া হয়। তাই অন্যান্য আসনের চাইতে এখানে ভোটগ্রহণের হার ছিল দ্রুত। সকাল আটটায় ভোট শুরুর সময় এ আসনের ব্লুমিং চাইল্ড হাই স্কুল কেন্দ্রে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। রায়ের বাজার কমিউনিটি সেন্টার কেন্দ্রে ৬টি বুথে প্রথম এক ঘণ্টায় ১১০ টি ভোট পড়তে দেখা গেছে। এ আসনের অন্যান্য কেন্দ্রেও ভোটার উপস্থিতি ও ভোট প্রদানের হার বেশ ভাল ছিল।
ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী:ঢাকা ১২ আসনেও সব কেন্দ্রে সব বয়সী নারী ও পুরুষ ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখো গেছে। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তেজগাঁও আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা নারী সাদিয়া রহমান জানান, ভোট কেন্দ্রে পৌঁছতে এবং ভোট প্রদান করতে বাড়তি কোন অসুবিধায় পরতে হয়নি, যা একটু লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ আসনের অন্যান্য কেন্দ্র ঘুরেও দেখা গেছে, শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আসন থেকে নির্বাচন করছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেছেন। বেলা ১২টার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিটিসিএল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন। ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে। ভোটের পরিবেশ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। সকাল থেকে ৯টি ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। তবে কোনো ধরনের অনিয়ম-সহিংসতা চোখে পড়েনি।’
ড. কামালের উদ্বেগ : ঢাকা-৮ আসনের ভিকারুন নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। গতকাল সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে ভোট দেন তিনি। ভোট শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভোটের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তবে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার বা ভোট দিতে না দেওয়ার সংবাদগুলো দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার অর্থ হল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেইমানি, শহীদদের সঙ্গে বেইমানি।’ জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
বিএনপি প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ: ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদের উপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার ছেলে মো. রবিন সাংবাদিকদের বলেন, শ্যামপুর স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে তাঁরা ভোট দিতে যান। ভোট দেওয়ার আগেই তারা জানতে পারেন তাদের পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ভবনের চতুর্থ তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় মহাজোটের প্রার্থীর সমর্থকরা তাঁদের ধাক্কা দেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করেন। এতে আমার পিতাসহ কয়েকজন আহত হন। পরে তাকে অ্যাপলো হাসপাতালে নেয়া হয়। তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই আসনের মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। তিনি বলেন, হামলার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা ও বানোয়াট।
বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া ঢাকার ঢাকা-৪, ৫ ও ৬ আসনে বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। কেন্দ্রগুলোতে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মত। সকাল ৯টায় ঢাকা-৬ আসনের সুরিটোলা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট নিতে দেখা যায়।
ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া: ঢাকা-২ আসনের কামরাঙ্গীরচর এলাকার কেমব্রিজ স্কুল কেন্দ্রের সামনে সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। কামরাঙীর চর থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নাইম আহমেদ অভিযোগ করেন, ‘যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এ খবর পেয়ে তারা কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।’ কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি শাহীন শেখ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
‘জানতে চাওয়া হয় কোন প্রতীকে ভোট দেব’: ঢাকা-১৪ আসনের কামাল আহমেদ মজুমদার স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে ভোট দেননি এমন একাধিক ভোটার অভিযোগ করেছেন, ‘কেন্দ্রে প্রবেশ পথে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কোন প্রতীকে ভোট দেব। আমরা কিছুই বলিনি। এ কারণে আমাদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতেই দেয়নি। নৌকায় ভোট দিব বললেই শুধু যেতে দেওয়া হয়।’ এই কেন্দ্রে অনেকে ভোটার নম্বর খুঁজে না পেয়ে ভোট না দিয়েই চলে যান। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক সাজু সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভোট শুরুর আগেই ৬০টি কেন্দ্র থেকে আমার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে।’
ভোট বন্ধ রাখার অভিযোগ:সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ করার কথা থাকলেও ঢাকা-১৪ আসনের দারুস সালাম, বিএডিসি ও এফএম স্কুল কেন্দ্রে ভোটারদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে এক ঘন্টারও বেশি সময় ভোট বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, দুপুরের খাবারের কথা বলে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়। এতে ভোটাররা দুর্ভোগে পড়েন।
ভোটারদের মারধর, স্লিপ ছাড়া কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি:ঢাকা ১৫ আসনের শেওড়াপাড়ার কামাল আহমেদ মজুমদার স্কুলের বাইরে ছিল দীর্ঘ লাইন। কিন্তু ভোট কেন্দ্র ছিল ফাঁকা। ভোটারদের অভিযোগ, তাদের ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকজনকে ধানের শীষের ভোটার সন্দেহ করে মারধর করে কয়েকজন যুবক। উত্তর ইব্রাহীমপুরের মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইব্রাহীমপুর শাখায় ভোট দিতে আসা অনেকেই অভিযোগ করেছে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গেটের কাছে আসলে বলা হয়, স্লিপ ছাড়া কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও কোথাও থেকে ভোটার স্লিপ সংগ্রহ করা যায়নি।
নাস্তার অজুহাতে ভোটগ্রহণ বন্ধ :ঢাকা-১৮ আসনের কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। কামারপাড়া স্কুল এন্ড কলেজের ১নং কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মাহমুদুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, এই কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা ৯২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী বললেন, ‘কয়দিন আর বাঁচুম, তাই ভোট দিতে আসছি।’
এই আসনের আরেক কেন্দ্র নয়ানগর রফিক সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের বাইরে অনেক ভোটার দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেও তাদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সকালের নাস্তা করার অজুহাতে এ সময় ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ মুয়াব্বির খান কোন মন্তব্য করেননি। তবে কিছুক্ষণ পরেই আবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
ঢাকা-১৭ আসনে বড় কেন্দ্রগুলোর একটি বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল এন্ড কলেজ। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। অভিনেতা তারিক আনাম খান বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল এন্ড কলেজে ভোট দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এখনো ভোট দেই নাই। তবে ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে ভালো লাগছে।’
সাংবাদিকের ওপর হামলা:এদিকে মগবাজারে বিটিসিএল স্কুল ভোট কেন্দ্রের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সকাল ৯টার দিকে হামলার শিকার হয়েছেন মানবজমিনের সিনিয়র রিপোর্টার কাফি কামাল। তিনি জানান, সকালে ইস্কাটন গার্ডেন স্কুলে ভোট প্রদান শেষে স্ত্রীকে বাসায় পৌঁছে দিতে অফিসের অটোরিক্সা নিয়ে মধুবাগ ফিরছিলেন তিনি। পথে বিটিসিএল স্কুল ভোট কেন্দ্রের সামনে দুটি ছেলেকে পিটাচ্ছিলেন কয়েকজন। এ দৃশ্য দেখে তিনি অটোরিক্সা থামিয়ে কয়েকটি ছবি তুলেন। তখন হঠাত্ করেই কয়েকজন যুবক তাকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারে এবং তার আইফোনটি ছিনিয়ে নেয়।
