প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন
এই বছরটি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। তার নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে বছরটির শুরু থেকেই আমরা বিশ্ব জুড়ে একটি দুর্যোগ মোকাবিলায় আছি। করোনা ভাইরাস মহামারিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৮৫টি দেশ পর্যুদস্ত। দেশের এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি নিরলসভাবে পরিশ্রম করছেন। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছি। একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এবারও বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আমরা সেভাবে এই বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করব। আমি সুনিশ্চিত, আমরা এর থেকে অচিরেই পরিত্রাণ পেয়ে আরো ভালোভাবে এগিয়ে যাব। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরোগ্য কাব্যগ্রন্থের ‘এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি’ কবিতার একটি লাইন মনে পড়ছে—
‘দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে’
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব গত দশকে অর্জিত আমাদের অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে যাতে না দিতে পারে সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়ও। উন্নয়নশীল ডিজিটাল বাংলাদেশে এ যেন আরেকটি যুদ্ধ। আমরা জানি, এই ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তার পরিকল্পনায় এদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম থেকেই এদেশকে আধুনিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েছেন। যেটি হচ্ছে : ভিশন ২০২১, ২০৩০, ২০৪১ (উন্নত বাংলাদেশ) এবং ২০৭১। ২০৭১ সালে আমরা স্বাধীনতার ১০০ বছর পালন করব। আমাদের রয়েছে শতবর্ষব্যাপী ডেল্টা প্ল্যান।
বর্তমানে দেশে যে দুর্যোগটি ছড়িয়ে পড়েছে তা মোকাবিলায় প্রথম সারিতে রয়েছেন চিকিত্সকেরা। সবার আগে এগিয়ে এসেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই দুর্যাগ মোকাবিলায় নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
আমি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণা করি, পড়ালেখা করি। এই মুহূর্তে আমি আমার লেখা ‘অদৃশ্য প্রযুক্তি’ থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যা এই ক্রান্তিকালে আলোচ্য হতে পারে।
‘মানুষ স্বপ্নচারী। মানবসভ্যতা সব সময়ই প্রযুক্তিনির্ভর এবং সামনের দিকে যেতে চায়। মানুষ কখনোই তার অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তাই কম্পিউটিং নিয়েও মানুষ উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করেছে। কম্পিউটার স্বপ্নচারী মানুষকে নিয়ে যাবে নবদিগন্তে। যার ফলে ভবিষ্যতে মানুষ বিমানব্যবস্থাকে আরো আধুনিক এবং নিরাপদ করে তুলতে পারবে।
‘জেট বিমানের সফটওয়্যার বর্তমানে আরো নিরাপদ করা খুব জটিল হলেও ভবিষ্যতে তা সম্ভব হবে। আরো বহুদূরের অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। মানুষের ক্যানসার আগে থেকেই নির্ণয় করা সম্ভব হবে, যার ফলে বেঁচে যাবে অসংখ্য জীবন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরো নিখুঁত হবে, যার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের মৃত্যুর হার কমে যাবে। ’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় এগিয়ে এসেছে। আমাদের আইসিটি মন্ত্রণালয়ও তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করছে। এগিয়ে এসেছে ইউজিসিও।
এ কারণেই আমি কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিষয়টি এনেছি। আমরা যদি গবেষণার মাধ্যমে কোয়ান্টাম কম্পিউটার আবিষ্কার করতে পারতাম, তাহলে আমি মনে করি আমরা বায়োলজিক্যাল সিক্যুয়েন্স তৈরি করতে পারতাম। ফলে আমরা যে কোনো অদৃশ্য শক্তিকেও পরাভূত করতে পারতাম। আমরা নোভেল করোনা ভাইরাসের মতো শক্তিকে সহজেই পরাভূত করতে পারতাম।
আমি বিশ্বাস করি, একদিন সমৃদ্ধ গবেষণার ফলে কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাদের নতজানু করতে পারবে না। মানুষ অসহায় হয়ে পেছনে পড়ে থাকবে না। এগিয়ে যাবে। আমি শিক্ষার্থীদের একটি কথা বলতে চাই— তাদের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সময়েও জ্ঞান অর্জনের পথে নানা বাধাবিপত্তি এসেছে। তাই জ্ঞান অর্জনের জন্য একনিষ্ঠ হতে হবে। জ্ঞানের ভাষা বুঝতে হবে।
আমি এর মাধ্যমে আপনাদের বোঝাতে চাই যে, আমরা যদি গবেষণায় এবং শিক্ষায় মনোনিবেশ করি, আমরা গ্যালিলিওর ভাষায় যদি দেখতে চাই, তাহলে আমাদের মহাবিশ্বকে বুঝতে হবে। আর মহাবিশ্বকে বুঝতে হলে মহাবিশ্বের ভাষা জানতে হবে। সেই ভাষাই হচ্ছে বিজ্ঞান, গণিত ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং যদি আমরা গবেষণা করি, বিজ্ঞানকে চর্চা করি, প্রযুক্তিকে চর্চা করি, তাহলে আমরা এগিয়ে যাব— এটা আমি একদম মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
আরেকটি বই আপনাদের হয়তো অনেকেরই চেনা ‘লাইফ অন দ্য এজ’। লিখেছেন জিম আল খালিলি ও ম্যাক ফাদেন। এটি তাদের তিন বছরের পরিশ্রমের ফল। এটি অনেকের কাজে লাগতে পারে। এটি দ্য কামিং অব কোয়ান্টাম বায়োলজি বিষয়ে উপস্থাপনা। জীবন কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে কোয়ান্টাম পার্টিকেল সম্পর্কে। মূলত আমাদের চারপাশে ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড়ো সব জিনিসই একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রিদমিক ছন্দের অংশ!
জাতির এই দুর্যোগ মুহূর্তে কিছু কথা বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এদেশকে পরিচালনা করছেন। সেক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আইসিটি মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সকলেই আমরা একতাবদ্ধভাবে কাজ করছি।
স্ট্যার্টআপ বাংলাদেশ যেটা করছে, তারা উদ্ভাবনের বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে। আপনারাও (শিক্ষার্থী-গবেষক-এন্টাপ্রেনিওর) উদ্ভাবনের দিকে নজর দেবেন। এখন সময়টা যেটা পাচ্ছেন তা কাজে লাগাতে পারেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মনে হলে বই পড়ুন, কিছু উদ্ভাবনী কাজ করুন যা ভালো লাগে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। সরকার যেসব বিধিনিষেধ দিয়েছে তা মেনে চলুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেসব স্বাস্থ্যবিধি দিয়েছে তা মেনে চলুন। ঘরে থাকুন, ঘরে থাকাটাই এখন যুদ্ধ। সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
আমাদের শৃঙ্খলাবোধ ও শিষ্টাচার থাকতে হবে। পাশাপাশি দৃঢ় মনোবল, সংকল্পবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের সহমর্মিতা, মানবিকতা ও সহযোগিতার মানসিকতায় থাকতে হবে। একতার বিকল্প নেই। সরকারের প্রতি আমাদের আস্থা অবিচল থাকতে হবে।
দুর্যোগে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা কখনো ভালো কিছু দিতে পারবে না। আমাদের সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুর মতো নেতৃত্ব পেয়েছিলাম। সেই সঙ্গে এখন তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্ব পাচ্ছি। আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেটা মনে রেখেই আমাদের সবকিছু মেনে নিতে হবে। আমরা গরিব দেশ, জনবহুল দেশ। সেসব বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। আইন মেনে চলতে হবে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা সবাইকে নিয়েই ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশে উন্নীত হব। আমরা দেশের কল্যাণে আরো বেশি পড়াশোনা করব, গবেষণা করব। তথ্যপ্রযুক্তিকে আমরা ধারণ করব এবং এর মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে আমরা আধুনিক বাংলাদেশে রূপান্তর করব। সেখানে উদ্ভাবিত হবে একটি চালিকাশক্তি। সেখানে সবাই এক হয়ে কাজ করব। দেশ এগিয়ে যাবে, আমরাও এগিয়ে যাব। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সুরে আমরাও সে ‘আশা’ নিয়ে স্বপ্ন দেখি সুন্দর আগামীর—
‘মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়
আড়ালে তার সূর্য হাসে।
হারা শশীর হারা হাসি
অন্ধকারেই ফিরে আসে।’
n লেখক: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)
