ডিভিডেন্ট ঘোষণার নতুন নীতি জারি

আপডেট : ১২ মে ২০২০, ০০:৫২

করোনা পরিস্থিতিতে ব্যাংকের মুনাফা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ না করতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংকটকালীন তারল্য পর্যাপ্ত রাখতে মুনাফা বিতরণ না করে মূলধন বাড়াতে বলেছে। তবে বিতরণ স্থগিত হলেও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী স্বার্থে ডিভিডেন্ট ঘোষণা করা যাবে। এর জন্য নতুন করে নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিমালার আওতায় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ট দেওয়া যাবে। গতকাল এসংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

করোনা সংক্রমণের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে গেছে। এই সময়ে বাজারে অর্থের সরবারহ ঠিক রাখা সবচেয়ে কঠিন। তাই বাজারে অর্থ সরবারহ স্বাভাবিক রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ডিভিডেন্ট বিতরণ স্থগিত করা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থগিত করেছে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি তোলেন অর্থনীতিবিদেরা। যদিও ব্যাংকের মালিকেরা এটি না করতে প্রভাব খাটান।

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করে গত ২০১৯ সালের ডিভিডেন্ট ঘোষণার নীতি জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর সুনির্দিষ্ট মূলধন রাখতে পারবে, তাদের ক্ষেত্রে ডিভিডেন্টের হার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রভিশন সংরক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে যারা ছাড় গ্রহণ করেছেন, তারা ডিভিডেন্ট ঘোষণা করতে পারবে না। এক্ষেত্রে ছাড় সমন্বয় করে মূলধন হিসাব করতে হবে। যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি তারা খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করলে তাদের মুনাফার পরিবর্তে লোকসান হওয়ার কথা। লোকসানী ব্যাংকে ডিভিডেন্ট দিতে পারে না। ডিভিডেন্ট ঘোষণা করার উদ্দেশ্যেই প্রভিশন সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করেছে ব্যাংক।

ডিভিডেন্ট নীতিমালায় বলা হয়েছে, ছাড় গ্রহণ ছাড়াই যেসব ব্যাংকের কনজারভেশন বাফারসহ মূলধন সাড়ে ১২ শতাংশ বা তার বেশি, তারা সর্বোচ্চচ ১৫ শতাংশ নগদসহ ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ট ঘোষণা করতে পারবে। যেসব ব্যাংকের মূলধন ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশের মধ্যে, তারা সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ডিভিডেন্ট দিতে পারবে। এর মধ্যে নগদ দিতে পারবে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ। আর যেসব ব্যাংকের মূলধন ১১ দশমিক ২৫ শতাংশের কম, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ৫ শতাংশ নগদসহ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ট দিতে পারবে। তবে ডিভিডেন্ট ঘোষণা করলেও ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে তা বিতরণ করা যাবে না। আর যেসব ব্যাংকের মূলধন একেবারে ন্যূনতম ১০ শতাংশ, তারা ৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ট দিতে পারবে। মূলধনের ঘাটতি থাকলে কোনো ব্যাংক ডিভিডেন্ট দিতে পারবে না। যেসব ব্যাংক ইতিমধ্যে ডিভিডেন্ট ঘোষণা করেছে, তাদের ঘোষণা এই নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা স্থগিত করতে হবে। 

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক নীতিমালা ব্যাসল-৩ অনুসারে ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকা এর মধ্যে যেটি বেশি তা মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক ১২টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি আছে ১২টি ব্যাংকের। এই ব্যাংকগুলো ডিভিডেন্ট ঘোষণা করতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা করে ব্যাংকগুলো যাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে অবদান রাখতে পারে, এর জন্য মুনাফা বিতরণ না করে মূলধন শক্তিশালী করতে হবে। এতে ব্যাংকের তারল্য পর্যাপ্ত থাকবে। আবার পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এর জন্য নীতিমালা জারি করা হলো।

করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার, যার বেশির ভাগই ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হবে। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা এবং তারল্য বৃদ্ধির বেশ কিছু নীতি ছাড় দিয়েছে। এর মধ্যে নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) কমানো, ঋণ আমানত সীমা (এডিআর) বাড়ানো, রেপোর সুদের হার কমানো এবং সিকিউরিটি বিক্রি করে টাকা নেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।