বায়ুদূষণ ও অ্যাজমা

আপডেট : ১২ মে ২০২০, ২১:২০

বাতাসে ভাসমান জৈব, অজৈব নানা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা থেকে শুরু করে ঘাস, বাঁশ, গাছগাছালি, নানা ধরনের শস্যের পত্র, পুষ্প, পরাগ, বাতাসে বিদ্যমান নানা ধরনের গ্যাস-কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড, অ্যামোনিয়া, মিথেন, গ্রাউন্ড লেবেল ওজন, বর্জ্যসহ নানা দাহ্য (কাঠ, কয়লা, কেরোসিন) পদার্থের ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, ডিজেল, পেট্রোলের মতো হাইড্রোকার্বন মাইক্রোড্রপলেট এবং অ্যাসিড অ্যারোসল অনেকের মধ্যে অ্যাজমা সৃষ্টি করতে পারে।

যারা নানা জৈব, অজৈব অ্যালার্জেন বিশেষ করে গ্লাইকোপ্রোটিনে সংবেদনশীল, তাদের নাক থেকে শুরু করে ফুসফুসের শেষ প্রান্ত জুড়ে প্রদাহ সৃষ্টির কারণে ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে যে সংকোচন হয় তাতে অক্সিজেন পরিসঞ্চালন কমেই শেষ হয় না, শ্বাসনালি ও ফুসফুসের প্রান্তিক কোষ বা অ্যালভিওলাইগুলো কিছুটা ফুলে নিজেরাই শ্লেষ্মায় পূর্ণ হয়। এতে সাঁইসাঁই বা মৃদু শব্দের সঙ্গে মৃদু থেকে তীব্র যে শ্বাসকষ্ট হয় এবং প্রশ্বাসে যে বিঘ্ন হয় তাকে সরল ভাষায় অ্যাজমা বা হাঁপানি বলা হয়।

তবে সব শ্বাসকষ্ট অ্যাজমা নয়। যারা জন্ম থেকে খাদ্যসহ নানা অ্যালার্জেনজনিত সংবেদনশীলতায় ভুগছে তারা ছাড়া বিশেষ পরিস্থিতি ও পরিবেশে অনেকের মধ্যে অ্যাজমা রোগ সৃষ্টি হয়। বায়ুদূষণের কারণে রাইনাটিস, কনজাংটাইভাইটিস ফ্যারিনজাইটিসসহ কাশি, ব্রংকাইটিস, ব্রংকিওলাইটিস সৃষ্টি হয় বা হতে পারে।

এই অ্যাজমার সঙ্গে চোখ, নাক, গলা, ত্বকের প্রদাহ, সর্দি, হাঁচি, কাশি অনেক উপসর্গ জড়িত থাকতে পারে। বিশেষ অ্যালার্জেনের প্রতি স্পর্শকাতরতা না থাকলেও কারো কারো ফুসফুসের প্রান্তিক কোষ বা অ্যালভিওলাইগুলোর ছিদ্র অনেক সময় রুদ্ধ হয়ে যায় বাতাসের ভাসমান কণায়। এতে সিওপিডি নামক অ্যাজমাসদৃশ্য আরো একটি রোগ সৃষ্টি হয়। অনেক সময় এই কারণে ফুসফুসের সম্প্রসারণশীলতা তথা অক্সিজেন পরিসঞ্চালন এতটা কমে যায়, যাতে মানুষের গড় আয়ু ৫-১০ বছরের বেশি কমে যায়। সিওপিডি হয়ে গেলে নিশ্চিতভাবে আয়ু সীমিত হয়ে যায়।

ঘরের ভেতর জীবজন্তুর লোম থেকে শুরু করে সিনথেটিক আঁশ, রান্নার ধোঁয়া, মসলার গন্ধ, খড়কুটোর গুঁড়ো, ঘাস, ছত্রাক বা মোল্ড, পাখির পালকের অংশ, তেলাপোকার ভগ্নাংশ ও মল, খাবার দাবারের ভগ্নাংশ এবং নানা ধরনের অর্গানিক ধুলো, মশার কয়েল, সিগারেটের ধোঁয়া অ্যাজমা সৃষ্টিতে কোনো না কোনো ভূমিকা রাখে। এদেরকে Provoking factor বা অ্যাজমা উদ্দীপক বলা হয়।

বায়ুদূষণকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে একটি ইনডোর বা ঘরের ভেতরের দূষণ আর একটি হলো ঘরের বাহিরের দূষণ। ২.৫ মাইক্রন আয়তনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে কণাগুলো নাকের লোম বা শ্লেষ্মা আটকাতে পারে না বা মাস্ক রুখতে পারে না, তা-ই অ্যাজমা তৈরি করে দীর্ঘ মেয়াদে ফুসফুসকে অকার্যকর করে তোলে। এতে এই কণাগুলো শুধু ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে অক্সিজেন পরিসঞ্চালন সীমিত করে না, নানা প্রক্রিয়ায় শরীরের কোষ ও নানা অঙ্গে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে মৃত্যু ত্বরান্বিত করে। সুতীব্র অ্যাজমাতে অনেক সময় অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যু ঘটে। প্রতি বছর সারা বিশ্বে এভাবে ৭ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটে।

ঘরের ভেতরে যে ভাসমান কণাগুলো শ্বাসকষ্ট শুরু করে তার মধ্যে অন্যতম নানা কীটপতঙ্গ ও খাবারে ভগ্নাংশ, জৈব, অজৈব আঁশ, জীবজন্তুর লালা, লোম, মূত্র এবং মাইট নামক একটি ক্ষুদ্র পরজীবীর মল।

ঘরের ভেতর কার্পেট, কম্বল, ভারী পর্দা সবই অ্যাজমা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এতে মাইটের মলের ভূমিকাই বেশি।

সুখের বিষয়, মাইট প্রোটিন রোধক ভ্যাকসিন অ্যাজমা সারিয়ে তোলে বা এর প্রকোপ কমিয়ে আনে। এর ব্যাপক ব্যবহার প্রয়োজন।

‘আরসিক’ পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, হাউজ ডাস্ট মাইট বা মাইট-১-এর কারণে শতকরা ৮৭.২৩ ভাগ রোগী অ্যাজমায় আক্রান্ত হচ্ছে।

‘শিশুদের মধ্যে ইনডোর দূষণজনিত কারণে অ্যালার্জি অ্যাজমা ঘটার বিষয়টি ০-৫ বয়সসীমায় নিম্ন পর্যায়ে থাকে। এ সময় অধিকাংশ অ্যালার্জি অ্যাজমা ঘটে থাকে অ্যাটোপিক বা জেনেটিক কারণে।

‘পুরুষদের অ্যালার্জি রেসপন্স ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ বছর বয়সসীমার পর তা কমতে থাকে। ৪১-৫০ বয়সসীমার পুরুষদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি রেসপন্স ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং ৫০ বছর বয়সসীমার পর তা আবার বৃদ্ধি পায়।   

‘যে ছত্রাক ও মোল্ডগুলো গৃহাভ্যন্তরে অ্যালার্জি তৈরি করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—Aspergillus, Candida, Tricophyton ইত্যাদি। আউটডোর পরিবেশে যে ছত্রাক ও মোল্ডস অ্যালার্জির কারণ ঘটায় তার মধ্যে অন্যতম হলো—Cladosporium, Alternaria ইত্যাদি।

‘ঘরের বাইরে যে ছত্রাকগুলো জন্মায় তার সঙ্গে সরাসরি পরিবেশের একটি সম্পর্ক রয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, অনিয়মিত দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি, উত্তাপ বৃদ্ধি ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে এর অনেকগুলোই সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে অধিক হারে জন্মাচ্ছে।’ সূত্র :অ্যালার্জি-অ্যাজমা সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিত্সা।

ঘরের ভেতরের অবস্থিত অ্যালার্জেনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পিএম১০ বা সাসপেন্ডেড পার্টিকেল। এর মধ্যে অর্গানিক ডাস্ট, চার্জড পার্টিকেল এবং ছাই (Ash) অ্যালার্জি-অ্যাজমার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে। ঢাকার বাতাসে এই সাসপেন্ডেড পার্টিকেল বা পিএম১০-এর মাত্রা বিপত্সীমার অনেক উপরে রয়েছে।

আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় ফুড অ্যালার্জি সংক্রান্ত যে পরিসংখ্যান বের করা হয়েছে তার মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি হলো—গরুর মাংস, হাঁসের মাংস, চিংড়ি, বেগুন ও পুঁইশাক। পাকা কলা ও আনারস এমনকি আলুর মতো নিরীহ সবজিতেও অ্যালার্জি হয়। 

শিশুদের মধ্যে প্রথম পাঁচ বছরে দুধ, ডিম, কলা, কমলা, নারকেল ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে  অ্যালার্জি কম হয়। তবে পাঁচ থেকে আট বছর পর শিশুদের মধ্যে ফুড অ্যালার্জি বেড়ে যায়। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি অ্যালার্জেনিক খাবার হলো—গরু, চিংড়ি, বেগুন, কলা, বাদাম ও নারকেল।

শিশুর জন্মের পর তার পরিবেশও ভবিষ্যতে অ্যালার্জি-অ্যাজমা ঘটাবার সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, যারা মাটির কাছাকাছি বা মাটির সান্নিধ্যে বসবাস করে তাদের মধ্যে অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম। Anxiety, Stress, depression Ges psychological development-এর সঙ্গে অ্যালার্জি অ্যাজমার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সূত্র :আরসিক গবেষণা ১৯৯৩-২০০৪ ও অ্যালার্জি-অ্যাজমা সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিত্সা।

অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ মুখ্য বিবেচনার বিষয় হলো ঘরের ও বাইরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং ঘরের ভেতরে জলীয় বাষ্প কমিয়ে আনা। এক্ষেত্রে জরুরি বিষয় হলো রোগীদের মুখ্য উদ্দীপক তথা দূষণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, তা পরিহারে জ্ঞান দেওয়া। অ্যাজমা ও অ্যালার্জি সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কেমিক্যাল মেডিয়েটারগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ফুসফুস সম্প্রসারণকারী ট্যাবলেট ও ইনহেলার প্রয়োগে রোগীকে দীর্ঘ সময় সুস্থ রাখা সম্ভব।

এছাড়া  নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন নানা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের উপদ্রব, যা অ্যাজমাকে জটিল করে তোলে। এই যেমন কোভিড-১৯-এর কাঁটাগুলোর গ্লাইকোপ্রোটিনই প্রাথমিক শ্বাসকষ্ট ঘটায়। এগুলো নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা না নিলে রোগীর কষ্ট ও মৃত্যু বাড়বেই।

সর্বোপরি বায়ুদূষণ রোধে ভূমির বনায়ন তথা নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে সঠিক সুরক্ষা প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। ‘পিওর ব্রিদিং রাইট’ আমাদের জন্মগত অধিকার।      

n লেখক : ইমার্জিং ডিজিজ ও অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ