জীবন, নাকি জীবিকা আগে?

আপডেট : ১৩ মে ২০২০, ২২:১৬

এই প্রশ্নটির মধ্যে অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব আছে। যেমন দ্বন্দ্ব রহিয়াছে ‘ডিম আগে নাকি মুরগি আগে’র জিজ্ঞাসার মধ্যে। যে কেহ খুব সহজেই বলিবেন, জীবন অবশ্যই আগে। কারণ, জীবন না থাকিলে জীবিকার কোনো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু জীবিকা না থাকিলে জীবন টিকিবে কী করিয়া? তাহার মানে, মহামূল্যবান জীবনকে রক্ষা করিতে জীবিকাই একমাত্র অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন ছাড়া বাঁচিবে না জীবন। স্পষ্টতই উভয়ে উভয়ের পরিপূরক। করোনার হাত হইতে জীবন বাঁচানোটাই এখন সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাইতেছে। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সর্বত্রই এক গণবিচ্ছিন্নতা দিনের পর দিন ধরিয়া চলিতেছে। তাহার ফলে জীবিকার প্রশ্নে বেশির ভাগ মানুষের পায়ের তলার মাটি সরিয়া যাইতেছে। কিন্তু তাহা আর কত দিন? সেই ২৬ মার্চ হইতে টানা লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ভয়াল স্থবিরতা জাঁকিয়া বসিয়াছে।

আসলে করোনা এক নূতন বিশ্বায়নের সূত্রে বাঁধিয়াছে আমাদের। এই বন্ধন সুখের নহে, অসুখের বিশ্বায়ন। আমোদ-প্রমোদ, জীবিকা, টাকাপয়সা ও মানবসম্পদের অবাধ বিশ্বময় যাতায়াতের মধ্য দিয়াই আমাদের এই জগত্ ‘উন্নয়নের ফানুসে’ উড়িতেছিল এতদিন। পুঁজিবিশ্বের দুরন্ত গতির এই ব্ল্যাকহর্সের চোখে লালপট্টি পরাইয়া দিয়াছে করোনা ভাইরাস। গোটা দুনিয়ার সীমান্তগুলি আটকাইয়া গিয়াছে। দুনিয়ার অংশ হিসাবে আমরাও বাঁধা পড়িয়াছি এই দমবন্ধ জগতে। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করিয়া বিপণিবিতান খুলিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হইলেও করোনাভীতি সিংহভাগ মানুষের মনে আরো বেশি করিয়া জাঁকিয়া বসিয়াছে। কারণ করোনার সংক্রমণ প্রতিদিন পূর্বের দিনকে ছাড়াইয়া যাইতেছে। যেই কারণে সরকারি-বেসরকারি অফিস অধিকাংশ এখনো বন্ধ। দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ। কলকারখানা অধিকাংশ বন্ধ। বন্ধ আমদানি-রপ্তানিও। বিমান চলাচল কবে শুরু হইবে, কেহ জানে না। তাহা হইলে জীবিকার কী হইবে? আর শুরুতে যাহা বলা হইয়াছিল, জীবনের পরিপূরক হিসাবে জীবিকা ধ্বংস হইলে জীবন বাঁচিবে কী করিয়া? এই জন্যই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ডন প্যাট্রিক বলিয়াছেন, ‘লকডাউনে দেশের অর্থনীতি লাটে উঠিতেছে। আমরা যাহারা সত্তরোর্ধ্ব, চলুন কাজে যাই। জীবিকা শুরু করি। মরিলে মরিব। কিন্তু দেশের অর্থনীতি শেষ হইতে দিব না।’ মার্কিন প্রশাসন জানাইয়াছে, করোনার কারণে শুধু এপ্রিলেই আমেরিকায় চাকরি খুইয়াছে ২ কোটি ৫ লক্ষ মানুষ। ইতিপূর্বে ‘গ্রেট রিসেশন’ সময়ে কাজ হারানো মানুষের চাইতে এই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি। কেবল তাহাই নহে, দেশটিতে বেকারত্বের হার পৌঁছাইয়া গিয়াছে ১৪.৭ শতাংশে। মহামন্দার পর আমেরিকায় এই হার আর কখনো এতটা উচ্চতায় পৌঁছায় নাই।

প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বে যেই মহামন্দা দেখা দিয়াছে, তাহার হিমালয়সম ঢেউ উন্নত দেশগুলি কোনোভাবে সামলাইতে পারিলেও তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির অবস্থা কী হইবে, তাহা আমরা চিন্তাও করিতে পারিতেছি না। করোনা ভাইরাস এখনো এতটাই রহস্যজনক ও অমীমাংসিত যে ইহা কতকাল ধরিয়া আমাদের নাকানি-চুবানি খাওয়াইবে, তাহা স্পষ্ট নহে। নানান ধরনের পূর্বাভাস থাকিলেও তাহা যে মিলিবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। সুতরাং নূতন এই বিবর্তিত সময়ে করোনার জটিল চশমায় মাপিয়া এখনই আমাদের আগামী পরিকল্পনা তৈরি করিতে হইবে।