শিশুরা আদরণীয়। তাহারা নিষ্পাপ। তাহাদের অমলিন হাসি কাহার না ভালো লাগে? তাহাদের মিষ্টি-মধুর কথা মানুষকে মোহিত করে। জগতের অনেক না পাওয়া ও হতাশাকে ভুলাইয়া দেয়। শিশুর সংস্পর্শে মানুষ এই জন্যই আসিতে চাহে। কিন্তু সেই শিশুরাই যখন নৃশংস নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, তখন তাহার চাইতে দুঃখজনক আর কী হইতে পারে? এমনই একটি নির্মম শিশু হত্যার ঘটনা ঘটিয়াছে বরিশালের হিজলা উপজেলায়। সেইখানে এক শিশুকে খালে নিয়া চুবাইয়া হত্যা করা হয়। নির্মমভাবে হত্যার পর বিবস্ত্র অবস্থায় সুপারিগাছের বাকল দিয়া গলায় বাঁধিয়া লাশ ঝুলাইয়া রাখা হয় গাছে। ছয় বত্সর বয়সি সেই হতভাগ্য শিশুটির নাম আরাফাত বালী। ইতিমধ্যে আরাফাতের বাবা বাদী হইয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করিয়াছেন। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হইয়াছে একজনকে।
বাংলাদেশে এই রকম শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা নূতন নহে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি বত্সরের প্রথম দুই মাসে সহিংসতার শিকার হইয়াছে ২৭৬ শিশু। ইহার মধ্যে হত্যার শিকার ৮৫ জন। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী গত বত্সরের প্রথম নয় মাসে হত্যার শিকার হয় ৩৩২ জন শিশু। তাহার আগের বত্সর হত্যা করা হয় ৫২১ শিশুকে। এই সকল তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া বলিবার অবকাশ নাই যে, এই বত্সর শিশু নির্যাতন ও হত্যা বহু গুণে বাড়িয়া গিয়াছে। তবে আমাদের সমাজে এখনো এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়াটাই লজ্জাজনক। এক জরিপে দেখা যায়, পাঁচ হইতে ১২ বত্সরের শিশুরাই সবচাইতে অধিক হত্যা ও সহিংসতার শিকার। তাহারা অবুঝ ও অসহায়। হত্যা ছাড়াও শিশুরা ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অপহরণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস ইত্যাদির শিকার হইয়া আসিতেছে। ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হইতেছে শিশু গৃহকর্মীরা। উদ্বেগের বিষয় হইল, এই সকল হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয় অর্ধেকেরও কম। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে বিচার হয় আরো কম। গত বত্সর ৩৩২ শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা হইয়াছে মাত্র ১৫১টি।
আমাদের দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে যথেষ্ট আইন রহিয়াছে। শিশুর কল্যাণ, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করিতে প্রণীত হইয়াছে শিশু আইন, ২০১৩। কিন্তু আইন থাকিলেই হয় না, আইনের প্রয়োগ থাকা লাগে। আইন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল মনোভাব লাগে। তাহা ছাড়া সমাজে মূল্যবোধ ও মানবিকতার চরম অবক্ষয় ঘটিবার কারণেও শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিতেছে। তুচ্ছ কারণে এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে গিয়া বাবাও যখন নিজ সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন বিস্ময়ের শেষ থাকে না। শিশুর প্রতি এই সহিংসতা আসলে দুর্বলের প্রতি সহিংসতারও নামান্তর। এই সমাজে দুর্বলরা নানা ক্ষেত্রে মার খাইয়া যাইতেছে। অতএব, আগামীর শিশুদের রক্ষায় আমাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটাইতে হইবে। তাহাদের পরিচর্যার মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে। সঠিকভাবে আইনের সুরক্ষা দিতে হইবে।
