ড. আর এম দেবনাথ
‘লকডাউনের’ হিসাব আর এখন করি না। দেখতেই পাচ্ছি আমরাসহ সারা বিশ্বের অগণিত মানুষ ‘লক-ডাউনের’ কারণে গৃহবন্দি-ঘরবন্দি জীবন যাপন করছে। চারদিকে ভয়ভীতি, উত্কণ্ঠা, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। চীন থেকে আগত করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে আমরা কবে মুক্তি পাব। সবার মধ্যে, সরকারের মধ্যে, বিশ্ববাসীর মধ্যে উভয় সংকট—জীবন, না জীবিকা। জীবন রক্ষা করতে হলে জীবিকা ছাড়তে হবে। আবার জীবিকা-রোজগার না থাকলে ‘দেহঘড়ি’ অচল হবে। আলো, বাতাস, জল ইত্যাদি বিনা পয়সায় পাওয়া যায়। কিন্তু চাল, ডাল, নুন, তেল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, জামা-কাপড়, ওষুধপত্র তো বিনা পয়সায় পাওয়া যায় না। অতএব বিবেচ্য বিষয়! কীভাবে জীবন বাঁচিয়ে জীবিকা রক্ষা করা যায়, রোজগার মোটামুটি ঠিক রাখা যায়, ভাতের ব্যবস্থা করা যায়। এখানেই দেখা যাচ্ছে অন্ধকারের মধ্যে কিছুটা আশার আলো। বৈশাখ মাস প্রায় শেষ। এখন বোরো ধানের সময়। এটা আমাদের সবচেয়ে বড়ো ফসল। তারপরেই আউশ ও আমন। সারা দেশ থেকে যা খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে মনে হয় বোরো ফসলটা কৃষকেরা ঘরে উঠেছে/উঠছে। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার ইত্যাদি অঞ্চলে এবার অকালবন্যা কোনো সমস্যা করেনি। উত্তরবঙ্গের খবরও ভালো। এই দুঃসময়ে বোরোর খবরটা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে কথা আছে। আউশের সময় এসে গেছে। করণীয় হচ্ছে এই ফসল যাতে নির্বিঘ্ন কৃষকরা লাগাতে পারে তার জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টা। এসবের মধ্যেই সামনে ঈদ, আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। পবিত্র ঈদের পরপরই বাজেট ঘোষণার কথা। দেখাই যাচ্ছে এবারের ঈদ আগের মতো হবে না। দোকানপাট অধিকাংশই বন্ধ। সতর্কতা হিসেবেই তা করা হয়েছে। আবার সমস্যা রয়েছে চাহিদারও। মানুষের হাতে পয়সা নেই। যারা ‘রেমিট্যান্স’ থেকে টাকা/ডলার পায় তাদের পকেটেও টান পড়েছে। বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা আতঙ্কে আছে, বাড়ি ফিরতে চায়। অনেকের বেকারের জীবন। দোকান কর্মচারী, ছোটো ছোটো দোকানের মালিক, হেয়ারড্রেসার, পলিশওয়ালা, দর্জি, চা-ওয়ালা, নির্মাণকর্মী, ওস্তাগার, কাঠমিস্ত্রি, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, প্লাম্বার, পত্রিকার হকার থেকে শুরু করে হাজার রকমের শ্রমজীবীর রোজগার নেই আজ দুই-আড়াই মাস। বাসার বুয়ারা কাজ করতে পারছে না। অনেক ব্যক্তিগত ড্রাইভার কর্মচ্যুত। পরিবহনকর্মীরা কর্মচ্যুত। বোঝাই যাচ্ছে, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবীর পকেটে কোনো টাকা নেই। অর্থনীতি অচল। কিছু কিছু পোশাক-কারখানা বন্ধ, শিল্পকারখানা বন্ধ। আমদানি-রপ্তানি সীমিত। ব্যাংক ব্যবসা সীমিত। বিমা ব্যবসায় বন্ধ। পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত। হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ। এ এক অকল্পনীয় অবস্থা। অর্থনীতির মন্দা-সংকট, মানুষের বাঁচা-মরার সমস্যা। বোঝাই যায় ‘করোনা-পরবর্তী’ অর্থাত্ লক-ডাউন পরবর্তীকালে বহু লোক বেকার হবে, বহুলোকের চাকরি যাবে। এর ফল কী? লক্ষ লক্ষ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। যারা এখন দারিদ্র্যসীমার ওপরে আছে তাদের অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে।
সরকার এসব বিষয়ে আমাদের চেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। ইতিমধ্যেই ১ লক্ষ কোটি টাকারও ওপর প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। বড়ো শিল্প, ছোটো-মাঝারি শিল্পের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। অনেক কর মওকুফ হয়েছে। ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার অর্ধেক করা হয়েছে। বাকি অর্ধেক দেবে সরকার ভর্তুকি হিসেবে। কৃষির জন্য বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে তা ৫ হাজার কোটি টাকার কম নয়। পেশা হিসাবে অনেককেই নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যে সরকার তার সাহায্য-সমর্থনের হস্ত প্রসারিত রেখেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে দুটো সমস্যা। প্রথমত প্রণোদনার অর্থ, ঋণ-সাহায্য যাতে দক্ষভাবে ব্যবহূত হয় তা তদারক করতে হবে। ত্রাণের চাল চুরির দৃষ্টান্তমূলক বিচার হচ্ছে। একইভাবে ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার ও নিশ্চিত করতে হবে। এই ধরনের জরুরি ঋণ কর্মসূচিতে ধান্দাবাজ ঋণগ্রহীতারা সমসার সৃষ্টি করতে পারে। বন্ধ কারখানাওয়ালারা ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল চাইতে পারে। ৫০ শতাংশ কাজ করে ১০০ শতাংশের ওপর প্রণোদনা চাইতে পারে। ইতিমধ্যেই একই শ্রেণির ব্যবসায়ীর মধ্যে ব্যাংকঋণ বাগিয়ে নেওয়ার তত্পরতা শুরু হয়েছে। এটা নির্মমভাবে রহিত করতে হবে। আবার দেখা যাচ্ছে, পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান যে সুবিধা পাবে তা অন্যান্য অনেক খাতের শিল্পই পাবে না। এটা শুধু বিবেচনা করে দেখা দরকার। শিল্পওয়ারি জরিপ করে প্রণোদনা নিরূপণ করা দরকার।
সাধারণভাবে নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হয় জুন মাসের প্রথমে। সারা মাস আলোচনার পর জুলাই মাস থেকে নতুন বাজেট কার্যকর হয়। এবারে যে সমস্যার মধ্যে আমরা পড়েছি তাতে কি সময়মতো বাজেট দেওয়া সম্ভব হবে? আমি জানি না। তবে দেরি করেই হোক আর সময়মতোই হোক, বাজেট দেওয়ার কাজটি হবে খুবই কঠিন। কারণ ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পারফরম্যান্স ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই। ‘করোনা ভাইরাস’ পূর্ণবর্তী অবস্থাতেও আমাদের অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে মিশ্র অবস্থা পরিলক্ষিত হয়, রেমিট্যান্স, আমদানি, রপ্তানি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অর্থনীতির পারফরম্যান্স ততটা আশাপ্রদ ছিল না। সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি ভালো ছিল না। কেবল মূল্যস্ফীতিটা ছিল নিয়ন্ত্রণে। গত দুই-তিন মাসে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এমতাবস্থায় বাজেটের প্রয়োজনীয় টাকা কোত্থেকে আসবে তা ভেবে দেখার বিষয়। জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন কীভাবে অব্যাহত রাখা যাবে। এসব প্রশ্ন নিশ্চয়ই সরকারের বিবেচনায় আছে। বিশেষ করে এবারের বাজেটে অনেক চাহিদা, চাওয়া-পাওয়ার দাবি থাকবে। মূল কথা হবে ‘চাহিদা’ সৃষ্টি। চাহিদা নেই, কারণ মানুষের রোজগার নেই, তাদের হাতে টাকা নেই। আগামী দিনে যদি মানুষ চাকরি হারায়, বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়, দারিদ্র্যসীমার নিচে লক্ষ লক্ষ মানুষ চলে যায়, তাহলে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি কীভাবে হবে তা বিবেচনা করে দেখতে হবে। এখানে শুধু গরিব, খেটেখাওয়া মানুষের কথা হচ্ছে না, কষ্টের মধ্যে থাকবে অনেক মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত লোকজন, বেওয়া-বিধবা, মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি শ্রেণির লোক। তাদেরও খরচের টাকায় টান পড়বে। এসব সামাল দিতেই হবে চাহিদা সৃষ্টির জন্য , ‘ডিমান্ড’ সৃষ্টির জন্য। সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লেও তা করতে হবে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকায়ও হাত দেওয়া যেতে পারে। কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়েও টাকা সরবরাহ করা যেতে পারে। কর্মে গতি এলে, অবকাঠামোর কাজ শুরু হলে, অর্থনীতি গতি পেলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কম হবে। আমার জানামতে, ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবসহ, নিম্নবিত্ত শ্রেণির হিসাব আছে দেশে ২ কোটিরও ওপরে। প্রত্যেক হিসাবে ২ হাজার টাকা দিলেও এর পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দেওয়া টাকায় ব্যবসার উন্নতি হতে পারে, তাতে ‘ডিমান্ড’ সৃষ্টি হবে না। গরিবের হাতে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের হাতে টাকা গেলে ‘ডিমান্ড’ তৈরি হবে। এর জন্য বাজেটে বেতনভুক্ত করদাতাদের কর হ্রাস করা যেতে পারে। ছোটো করদাতাদের কর হ্রাস করা যেতে পারে। আরেকটা দুঃসাহস করি। আর সেটা অর্থ-জোগান প্রশ্নে। দেশবাসী দুই-এক বছর আগে না চাইতেই সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করে দিয়েছিল। এই দুঃসময়ে তারা ১০-২০ শতাংশ বেতন সরকারকে দিতে পারে। এতে তারা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ তাদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত। সংসদ সদস্যরা তাদের ভাতা থেকে সরকারকে কিছু প্রদান করতে পারে। বড়ো বড়ো ধনীরা ভারতের শাহ্রুখ খানদের মতো উদার হস্তে সরকারি তহবিলে দান করতে পারেন।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিশেষে একটি সুপারিশ রাখতে চাই। অন-উপার্জিত টাকা দেশে আছে। ঘোষণা নয়, তাদেরকে বলা হোক ব্যাংকে জমা দিতে। ১০-২০ শতাংশ কর নিয়ে নেওয়া হোক। তবে এই টাকা তিন বছর তোলা যাবে না। এখান থেকে সরকার ঋণ নেবে। ব্যাংক সার্টিফিকেট কর কর্মকর্তারা গ্রহণ করে নেবেন কোনো প্রশ্ন ছাড়া।
লেখক : অর্থনীতিবিদ
