ফার্মাসিস্টদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা

আপডেট : ১৩ মে ২০২০, ২২:১৮

মো. ইমরান হোসেন

ডাক্তার ও ফার্মাসিস্টরা হলেন রোগীর স্বাস্থ্যসেবার বিকল্পহীন অবলম্ব্বন। রোগীর রোগনির্ণয়ে ডাক্তাররা যেমন বিশেষজ্ঞ, ঠিক তেমনি ওষুধ নিয়ে বিশেষজ্ঞ হলেন ফার্মাসিস্টরা। একজন ডাক্তারের কাজ হলো রোগীর রোগ নির্ণয় করে একটি প্রেসক্রিপশন বা নির্দেশনা একজন ফার্মাসিস্টের কাছে পাঠানো। আর ফার্মাসিস্টের কাজ হলো প্রেসক্রিপশন পুনঃপরীক্ষণ, ওষুধ তৈরি, রোগীকে বিতরণ এবং ওষুধের ব্যবহারবিধি ও সংরক্ষণ নিয়ে রোগীকে পরামর্শ প্রদান। উন্নত বিশ্বের সবগুলো দেশেই ডাক্তার ও ফার্মাসিস্টদের কাজের এমন সমন্বয়েই রোগীর চিকিত্সা প্রদান করা হয়। ফলে রোগীও পায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা। এজন্য উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবার মানও হয় অনেক উন্নত। এবার আপনি বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালে যান, সেখানে ফার্মাসিস্ট নামের কোনো পেশাজীবীকে খুঁজে পাবেন না! তাহলে ফার্মাসিস্টদের কাজ কারা করছেন? ডাক্তার আর নার্সদের মাধ্যমে জোড়াতালি দিয়ে ফার্মাসিস্টদের কাজ খুবই অল্প পরিসরে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। ফলে রোগীরা যেমন সঠিক চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি ডাক্তার-নার্সদের দায়িত্বের বাইরেও ‘প্রক্সি’ দিতে হচ্ছে ফার্মাসিস্টদের কাজের।

বাংলাদেশের ফার্মাসিস্টরা কেবল ওষুধ কোম্পানিতে ওষুধ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সেখানে তারা রাখছেন তাদের মেধা ও দক্ষতার স্পষ্ট স্বাক্ষর। এজন্যই আজ বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা মেটাচ্ছে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো। বর্তমানে বাংলাদেশের ২৫৭টি ওষুধ কোম্পানিতে প্রতি বছর ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উত্পাদিত হচ্ছে। বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল উত্পাদন করছে কোম্পানিগুলো। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ১৮২টি ওষুধ কোম্পানি এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই ওষুধশিল্প থেকে ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। দেশের এই বিশাল সম্ভাবনায় ক্ষেত্রের কারিগর হলেন আমাদের ফার্মাসিস্টরা। দেশের এই দক্ষ ফার্মাসিস্টদেরকে উন্নত দেশগুলোর মতো সরাসরি স্বাস্থ্যসেবায়ও যুক্ত করা গেলে চিকিত্সাসেবার মান দ্রুতই উন্নত করা সম্ভব।

পৃথিবীর বর্তমান করোনা দুর্যোগেও উন্নত বিশ্বের ফার্মাসিস্টরা রাখছেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনা থেকে সুস্থ হয়েই হাসপাতালে কর্মরত ‘ওয়ান্ডারফুল ফার্মাসিস্ট’দের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি। তাছাড়া পৃথিবীতে কোভিড-১৯-সহ অন্য যে কোনো রোগের ওষুধ বা ভ্যাকসিন এলে তার পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে শুরু করে রোগীর মনিটরিং পর্যন্ত সব ধাপে কেবল ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্টরাই নিশ্চিত করতে পারেন নিরাপদ ও কার্যকর প্রয়োগ। সেজন্য করোনা দুর্যোগেও ফার্মাসিস্টদের রয়েছে বিশেষ ও স্বতন্ত্র ভূমিকা। ফার্মাসিস্টদের অংশগ্রহণ ছাড়া এই দায়িত্বটি অন্য কোনো পেশাজীবীরা সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন না। তাই করোনা দুর্যোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ফার্মাসিস্টরা হতে পারেন প্রথম সারির সৈনিক।

সরকার ফার্মাসিস্টদের কাজে লাগাতে যত দেরি করবে, রোগীর সেবা এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাত তত পিছিয়ে থাকবে। ২০১৮ সালে যেহেতু ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ নিয়োগের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তাই আর দেরি না করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা সরকারি কর্ম-কমিশনের মাধ্যমে দেশের ফার্মাসিস্টদের দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। তবেই রোগীর স্বাস্থ্যসেবা হবে নিরাপদ ও কার্যকরী। অন্যথায় বাংলাদেশের রোগীরা কেবল বঞ্চিতই হবেন!

লেখক :শিক্ষার্থী, 

ফার্মেসি বিভাগ,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়