করোনা সংকট এবং ধর্ষকদের দুঃসাহস

আপডেট : ১৩ মে ২০২০, ২২:১৮

মীর আব্দুল আলী

কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস আতঙ্কে গোটা বিশ্ব থমকে গেলেও ধর্ষকদের কুকর্ম থেমে  নেই। আসলে ওদের মৃত্যুভয় নেই। যেখানে সবাই এখন সৃষ্টিকর্তাকে বেশি বেশি করে জপছে সেখানে তারা নারীর প্রতি সহিংস হচ্ছে। ওরা বড়ো অমানুষ! তাই তো ওরা এমন দুঃসময়েও পৈশাচিক কাজে নিজেদের লিপ্ত করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, বহির্বাণিজ্য সব কিছু এখন বন্ধ। ওদের অপকর্মের দুয়ার কেবল খোলা। খুলনা, লক্ষ্মীপুর, পঞ্চগড়, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল সবখানেই ধর্ষিত হচ্ছে নারী। এদেশে করোনা সংকটে ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের চিত্র বড়োই ভয়ংকর।

এখানে যে কটির বর্ণনা দিচ্ছি সব ঘটনাই গত এক মাসে দেশের কোনো না কোনো  জেলায় ঘটেছে। খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানাধীন যোগীপোলে চতুর্থ শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রী (১৪) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় ঐ ছাত্রীর মা বাদী হয়ে ২ মে নগরীর খানজাহান আলী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তিন বন্ধু মিলে ঐ মাদ্রাসা ছাত্রীকে সুকৌশলে ডেকে পার্শ্ববর্তী পরিত্যক্ত বাসভবনে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এর আগে রাজধানী ঢাকার পাশে রূপগঞ্জে তিন বন্ধু কাঞ্চন পৌরসভার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে ডেকে ধর্ষণ করে। এদিকে পঞ্চগড়ে ধর্ষণের অভিযোগে সালিশে নির্যাতন, অপমানে কিশোর আত্মহত্যা করেছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের সোনারবান-বাঁশবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নওগাঁর ধামইরহাটে এক কিশোরীকে (১৬) গণধর্ষণের অভিযোগে উঠেছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সাত বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদপুরে সদর উপজেলায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণার পর, এমনকি করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ধর্ষকদের দুঃসাহসেরই প্রমাণ মিলে। এ জাতীয় যৌন-ব্যভিচার কী বন্ধ হবে না? মানুষরূপী নরপশুরা সভ্যতার ভাবধারাকে পালটে দিতে কি হায়েনার নখ মেলেছে? 

প্রশ্ন হলো, দেশে এত ধর্ষণ হচ্ছে কেন? তা রোধের উপায় কী? যৌন নির্যাতন বন্ধে আগে মানসিকতা বদলাতে হবে। ধর্ষণ কমাতে হলে আগে পুরুষের মাঝে মানবিক গুণাবলি জাগ্রত করতে হবে। ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। লোভ-লালসা-নেশা, উচ্চাভিলাষ, পর্নো-সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি কামোত্তেজনা মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে তা বর্জন করতে হবে। পর্নো সাইডগুলো বন্ধ করতে হবে যেন মোবাইল কিংবা কম্পিউটারে তা  কেউ দেখতে না পারে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এ ধর্ষণ শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণ বাড়ছে, দেখা যাচ্ছে ধর্ষণকারীর সাজা না হওয়া তার অন্যতম প্রধান কারণ। এশিয়ার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশে ধর্ষণের অপরাধ বেশি হয়ে থাকে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই বেশি।

বর্তমানে আমরা ঈমানশক্তি হারিয়েছি। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, যৌন কামনা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রেরণা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাই সমাজ থেকে সুখ, শান্তি বা আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠনমূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীতলিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌনকামনার প্রভাবে আমাদের মধ্যে ধর্ষণ, জেনা, পরকীয়া প্রেম ইত্যাদির প্রবণতা বাড়ছে।

 যৌন-ব্যভিচার সর্ব যুগে, সর্ব ধর্মমতে নিন্দনীয় নিকৃষ্ট পাপাচার। ধর্ষণের চূড়ান্ত শাস্তির বিধান মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এ যাবত্ যতগুলো ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার যথাযথ বিচার সম্পন্ন হয়েছে এরূপ নজির কমই আছে। হয় চূড়ান্ত রিপোর্টে ঘাপলা নয়তো সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রভাবিত করে অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকই। উপরন্তু এর বিচার চাইতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীরা নির্বিচারে পালটা হত্যার হুমকি, কখনো কখনো হত্যার শিকার ও হয়রানির শিকার হন। এ অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।  সর্বোপরি নারীদের জন্য ঘরের বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এটা স্পষ্ট যে বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধ প্রশ্রয় দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজটিই বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। সে লক্ষ্যে সততা, আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা চাই। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করবে—এমনটাই সকলের প্রত্যাশা।

 লেখক : গবেষক।