তরুণ কবি তাহার কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘লেপ্টে দিল শরীরের সব কটা ইন্দ্রিয়ের দরোজায়,/ মানব পাপের বোঝা বয় বসুমতি!/ নিউটনের থার্ড ল’ বুঝিয়ে দেবেই/ প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবেই।’ নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দিনে দিনে যতই বৃদ্ধি পাইতেছে, মানুষের মধ্যে ততই এই বোধ উপলব্ধ হইতেছে যে, প্রকৃতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করিলে সে যে কোনো উপায় প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়া আপন পথে চলিবার পথ করিয়া লইবে। আধুনিক প্রযুক্তির বিশৃঙ্খল ব্যবহার, প্রকৃতির সহিত স্বেচ্ছাচারিতা, প্রকৃতিকে রক্ষা করায় অসচেতনা বিশ্বপ্রকৃতিকে এতটাই বৈরী করিয়া তুলিয়াছে যে অভিনব পথে মানুষের উপর দুর্যোগ নামিয়া আসিয়াছে। যেই মানুষ দাপাইয়া বেড়াইয়াছে প্রকৃতির কোলে, ক্ষতবিক্ষত করিয়াছে তাহার দেহ রূপ—সেই মানুষকে আজ ঘরবন্দি হইয়া বসিয়া থাকিতে বাধ্য করিয়াছে। ফলে গোটা মানবজাতিকে আজ নূতন এক যুদ্ধে নামিতে হইয়াছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরেস যথার্থই বলিয়াছিলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নোভেল করোনা ভাইরাস বিশ্বের কাছে সর্ববৃহত্ চ্যালেঞ্জ। এত বড়ো যুদ্ধ, এত কঠিন যুদ্ধ মানবজাতিকে একই সঙ্গে লড়িতে হয় নাই। এই যুদ্ধে প্রতিপক্ষ চক্ষুর আড়ালে থাকিয়া আক্রমণ করিতেছে।’
কেন হইবে না? দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গলকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ উত্পন্ন হয় এই জঙ্গল হইতে। কিন্তু মানুষের লোভ পড়িয়াছে ঐ ফুসফুসের দিকে। নির্বিচারে মাইলের পর মাইল বৃক্ষ কাটিয়া উজাড় করা হইতেছে। মানুষের শক্ত থাবা পড়িয়াছে ফ্লোরা অ্যান্ড ফাউনায়। পৃথিবীর বুক হইতে ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হইয়াছে বহু ধরনের ফুল, ফল ও প্রাণী। তবে এমন নহে যে এই প্রথম আমরা প্রকৃতির হামলা দেখিতে পাইতেছি। ৫ হাজার বছর পূর্বে বর্তমান চীনেরই একটি এলাকা জনশূন্য হইয়া গিয়াছিল। তখন হইতেই দীর্ঘ বিরতিতে প্রকৃতি বারংবার বৈরী হইয়াছে। কিন্তু আধুনিক কালে আমরা অতি ঘনঘন হামলার শিকার হইতেছি। একবিংশ শতাব্দীতে এইডস, সোয়াইন ফ্লু, ইয়েলো ভাইরাস, সার্চ, মার্স দেখিয়াছি। কিন্তু তাহা ছিল যেন মহড়া।
এই ভাইরাস শুধু স্বাস্থ্যগত নহে, মানুষের জীবনেও আনিতেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বহু পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন, আর্থসামাজিক বিবেচনায় পৃথিবী আর কখনোই পূর্বের অবস্থায় ফিরিবে না। একজন রিকশাচালক হইতে শুরু করিয়া সচিব পর্যন্ত সকলের জীবনে, জীবনযাপনে পরিবর্তন ঘটিতেছে। এই পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হইবে তাহা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কেহ জানে না। কতকাল এই যুদ্ধ করিতে হইবে? বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলিতেছিল, তাহা কোথাও স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে, কোথাও মন্থর হইয়া গিয়াছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ইতিমধ্যেই কর্মহীন হইয়া পড়িয়াছে। আরো কত পড়িবে তাহা লইয়া এখনো বিশেষজ্ঞদের মধ্যে জটলা চলিতেছে। বিশ্বব্যাপী শ্রমিক তাহার মজুরি চাহিতেছে, উত্পাদন না থাকায় মালিক মজুরির অর্থ জোগাইতে অপারগ হইতেছেন। এই অর্থনৈতিক বন্ধত্বের শেষ কোথাও তাহা বুঝিতে না পারিয়াও হতাশা আরো বাড়িয়া যাইতেছে। যদি দুই এক মাসের মধ্যে সকল কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবে শুরু করা যায়, তাহা হইলে আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিব।
