ক্ষুধা ও করোনার বিরুদ্ধে লড়ছেন বিদ্যানন্দের কর্মীরা

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ২৩:০১

প্রতিদিন ২৪ হাজার মানুষকে দিচ্ছেন রান্নাকরা খাবার

ইত্তেফাক রিপোর্ট

লকডাউনের এই সময়ে কিছু মানুষকে ঘুমাতে যেতে হচ্ছে ক্ষুধা পেটে নিয়ে। করোনা সংক্রমণের ভয়ের পাশাপাশি মানুষকে তাড়া করছে আগামীকাল কী খাবে সেই চিন্তাও। এসব মানুষকে যাতে ক্ষুধা পেটে ঘুমাতে যেতে না হয় সেই চেষ্টাই করে চলেছেন নগরের একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ। এই তরুণদের একটি বড়ো অংশ বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নগরের অনেক নিরন্ন গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ত্রাণ, রান্নাকরা খাবার। সারা শহরে ছেটাচ্ছেন জীবাণুনাশক। বিদ্যানন্দের তরুণরা একই সঙ্গে লড়ছেন ভাইরাস এবং ক্ষুধার বিরুদ্ধে।

আনন্দের সঙ্গে বিদ্যার্জনের নীতিতে যাত্রা শুরু করেছিল বিদ্যানন্দ। মূলত সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু বা বস্তির শিশুদের জন্য কাজ করত তারা। ছিন্নমূল শিশুদের লেখাপড়া শেখানো, খাবারের বন্দোবস্ত করাই ছিল সংগঠনটির মূল কাজ। কিন্তু যে শিশুদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে চান, তারা যেন মাথা উঁচু করে বাঁচে সেই ভাবনা থেকে শুরু হয় ‘এক টাকায় আহার’ নামের অভিনব কার্যক্রম। শিশুরা এক টাকার বিনিময়ে পেটপুরে খাবার কিনে খেত পারে। একই সঙ্গে তারা শুরু করেছিল পাঁচ টাকায় বাসন্তী স্যানিটারি প্যাড নামের আরো একটি কার্যক্রম। তাদের সর্বশেষ উদ্যোগ ছিল, শুধু মেয়েদের জন্য ‘বাসন্তী নিবাস’ নামের ক্যাপস্যুল হোটেল।

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের শুরু হতেই মানুষের জন্য ত্রাণ ও সাহায্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। তখনই টার্গেট নিয়েছিল ২ লাখ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেবে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার পরিবারের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে পেরেছেন বলে জানালেন বিদ্যানন্দের ঢাকা বিভাগীয়প্রধান সালমান খান ইয়াসিন।

তিনি জানালেন, ত্রাণ বিতরণে প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা পাচ্ছেন তারা। পুলিশ বাহিনী তো বটেই, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও র্যাবের মাধ্যমে দেশব্যাপী মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন ত্রাণসামগ্রী। প্রশাসন ছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের ত্রাণ বিতরণে সাহায্য করছে। সালমান বললেন, এই মুহূর্তে ত্রাণের চাহিদা প্রচুর। যে এলাকায় একসঙ্গে অনেকগুলো চাহিদা আসে, সেখানেই যান তারা। তবে যাদের কাছে পৌঁছাতে পারেন না, তাদের জন্য কষ্ট হয়। এভাবে প্রতিদিন ৮ হাজার পরিবারের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে বিদ্যানন্দ। প্রতি পরিবারের জন্য তাদের খরচ ১০১ টাকা; ৮ লাখ ৮ হাজার টাকা।

এই বিপুল অঙ্কের টাকার পুরোটাই আসে মানুষের ডোনেশন থেকে। দেশ এবং বিদেশের বাংলাদেশিদের দেওয়া টাকা থেকেই চলে এই বিপুল কর্মযজ্ঞ। ব্যক্তি পর্যায়ে ছাড়াও দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যাংক, এনজিও থেকেও আসে বড়ো অঙ্কের অনুদান। করোনাকালে সেই প্রাতিষ্ঠানিক অনুদানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা। সর্বনিম্ন অনুদানের পরিমাণ এক টাকা হতে পারে হলেও জানান। তিনি বলেন, বিকাশ অ্যাপে বিদ্যানন্দকে ডোনেশনের একটা অপশন আছে। সেখানে এক টাকা, দুই টাকা বা পাঁচ টাকাও পাঠান অনেকে। এছাড়া তাদের বিকাশ নাম্বারে ব্যক্তিগত অনুদান তো পৌঁছাচ্ছেই।

নিজেদের সুযোগ-সুবিধা, আরাম-আয়েশ, এমন কি পরিবারের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তারা দিনের পর দিন ঘরের বাইরে থাকেন। এই রোজার মাসে রাতভর ত্রাণ ও খাবার বিলি করে নিজেরা হয়তো রাস্তার ধারে ধারে বসেই খেয়ে নিচ্ছেন এক প্যাকেট ত্রাণের খাবার। শুধুই ত্রাণ নয়, মার্চের শুরু থেকেই তারা শহরময় জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছেন নিজ উদ্যোগে।

এ বিষয়ে সালমান জানালেন, জীবাণুনাশক দিচ্ছে দেশের নামকরা একটি কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি। তাদের সাহায্যেই বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৬ হাজার লিটার জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছেন। বিশেষত হাসপাতালগুলোর আশেপাশে।

ত্রাণ ছাড়াও তারা ঢাকা ও চটগ্রামে প্রতিদিন ২৪ হাজার মানুষের কাছে রান্না করা খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন বিদ্যানন্দের কর্মীরা। ঢাকার খিলগাঁওয়ের শাহাজাহানপুরে রান্না হয় এই বিপুল পরিমাণের খাবার। ২০ জন পেশাদার বাবুর্চির সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবীরা। রান্নাকরা খাবারের সঙ্গে দেওয়া হয় ডিম ও মুরগির মাংস। এতদিন দিনে ৬০০ কেজি মুরগির মাংস কিনতেন বলে জানালেন সালমান। তবে এখন থেকে একটা প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে মুরগির মাংস দেবেন বলে জানিয়েছেন। আর বিদ্যানন্দের ‘এক টাকায় আহার’ প্রকল্পের সময় থেকেই প্রতিদিন ডিমের চাহিদা পূরণ করে দেশের একটি নামকরা অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড। এখন এই করোনার সময়ে তারা প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ হাজার পিস ডিম সাপ্লাই দিচ্ছেন। এছাড়া কেউ এসে দিয়ে যান সবজি, কেউ চাল, কেউ ডাল আবার কেউ বা কয়েকটা মুরগি। যার যতটুকু সামর্থ্য।