ফান্ডে পড়ে আছে ৪১০ কোটি টাকা, অথচ ত্রাণের জন্য রাস্তায় ঘুরছেন শ্রমিকরা

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ২৩:১২

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ফান্ডে ৪১০ কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। করোনার এই দুর্যোগে ঐ ফান্ড থেকে শ্রমিকদের সহায়তা করার দাবি জানিয়ে আসছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। কিন্তু ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে সুযোগ না থাকায় এই টাকা খরচ করা যাচ্ছে না। শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের কল্যাণে যে ফাউন্ডেশন সেই প্রতিষ্ঠান থেকে যদি বিপদের সময় সহায়তা না পাওয়া যায় তাহলে এই প্রতিষ্ঠান থেকে লাভ কি? অথচ সারাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক ত্রাণের জন্য রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। অনেক শ্রমিক অর্ধাহারে, অনাহারে আছেন। এখনই তাদের সহযোগিতা করার উপযুক্ত সময়।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ড. মো. রেজাউল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ফাউন্ডেশনে এখন ৪১০ কোটি টাকার মতো আছে। এই টাকা আমরা চাইলেই খরচ করতে পারি না। এই টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে ফিক্স ডিপোজিট হিসেবে রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী টাকার লভ্যাংশ আমরা খরচ করতে পারি। তাও আইনের বিধিবিধান মেনে। সেখানে শ্রমিকরা আহত, নিহত হলে বা কোনো শ্রমিকের সন্তানের শিক্ষার জন্যসহ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আমরা তাদের আবেদনের ভিত্তিতে চেকের মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে থাকি। পুরনো আবেদনের বেশ কিছু টাকা ইতিমধ্যে আমরা ছাড় করেছি। তবে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জীবন চলার জন্য কোনো টাকা আমরা দিতে পারি না। সেটা দিতে হলে আইন পরিবর্তন করতে হবে। ইতিমধ্যে বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। শ্রম প্রতিমন্ত্রী এই বোর্ডের চেয়ারম্যান। সচিবসহ মালিক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধিরাও এই বোর্ডে আছেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

তবে বাংলাদেশে শ্রমিকদের সবচেয়ে বড়ো সংগঠন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিপদের সময়   তো আইন দেখিয়ে লাভ নেই। এখন যেখানে শ্রমিকদের জীবনই বিপন্ন সেখানে আইনের জুজু দেখিয়ে তারা শ্রমিকদের কোনো ধরনের সহায়তা করছে না। এই টাকা তো শ্রমিকদের কল্যাণেই খরচ করার কথা। তাহলে কেন সবচেয়ে বড়ো সংকটময় সময়ে সেটা দেওয়া হবে না। আমাদের ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকা শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এ পর্যন্ত খাদ্য ও আর্থিক সহায়তাসহ ৩ কোটি টাকা শ্রমিকদের দিয়েছে। এখন ইউনিয়নগুলোর ফান্ড তো সামান্য। তারা যতটুকু পারছে সেটা করছে। শুধু পরিবহন সেক্টরেই ৭০ লাখ শ্রমিক আছে। এর মধ্যে মহাখালী টার্মিনালের ইউনিয়ন আর্থিকভাবে একটু স্বাবলম্বী। তারা ৩৫ লাখ টাকা খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। আর ১ হাজার ২০০ শ্রমিককে ২ হাজার টাকা করে ২৪ লাখ টাকা দিচ্ছে। কিন্তু এত শ্রমিকের মধ্যে এই সহায়তা তো খুব বেশি না।’   

লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সারাদেশের পরিবহন শ্রমিকরা চরম সংকটে পড়েছেন। নিজেদের কল্যাণে প্রতিদিন দেওয়া চাঁদার হিসাব নেই তাদের কাছে। সেই তহবিল থেকেও সাহায্য না পাওয়ার অভিযোগ তাদের। পরিবহন শ্রমিকদের প্রতি পদে পদে চাঁদা দিতে হয়। প্রতিদিন কল্যাণের নামে তাদের কাছ থেকে আদায় করা ঐ চাঁদা এখন বিপদের সময়ে তাদের কোনো কাজেই আসছে না। পরিবহন  সেক্টরে মালিক সমিতি বা ইউনিয়নের নামে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে এটা হাজার কোটি টাকার বেশি। 

তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহাজাহান খান এমপি বলেছেন, ‘অনেকেই ভুল করে ফেডারেশন আর ফাউন্ডেশন এক করে ফেলেন। আর ফেডারেশন কোনো চাঁদা নেয় না। যে চাঁদা তোলা হয় সেটা ইউনিয়ন থেকে। সেই টাকা শ্রমিকদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয়। এই দুর্যোগে ইউনিয়নগুলো যথাসম্ভব শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আর ফাউন্ডেশনের টাকা খরচ করা হয় শ্রম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে।’

গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে চলছে সাধারণ ছুটি। একই দিন থেকে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। এরই মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে ৪৮ দিন। অন্য অনেক পেশার মতো আয়-রোজগার বন্ধ ৭০ লাখের বেশি পরিবহন শ্রমিকের। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পরিবহন শ্রমিকরা। সারাদেশে ২৪৯টি শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। ঢাকায় বাস ও ট্রাক টার্মিনাল কেন্দ্রিক শ্রমিক ইউনিয়ন ছাড়াও প্রতি জেলায় অন্তত দুটি করে বাস ও ট্রাকের শ্রমিক ইউনিয়ন আছে। শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তথ্য বলছে,  দেশের সড়ক পরিবহন সেক্টরে মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনের সংখ্যা ৯৩২টি। স্বাভাবিক সময়ে এই শ্রমিক সংগঠনগুলোকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছেন শ্রমিকরা। এখন বিপদে কাউকেই তারা পাশে পাচ্ছেন না।