করোনার থমকে-যাওয়া সময়ে পুরনো দিনের কত কথা উঁকি মারে ক্ষণে ক্ষণে। কেমন ছায়াছবির মতো ছিল সেসব দিন! এই যেমন এখন মনে পড়ে গেল ক্লাস নাইনের একটি ঘটনা। আমার এক বন্ধু কলোনিতে থাকত। একদিন বাসায় এসে বলল, আমাকে একটা উপপাদ্য বুঝিয়ে দাও, ক্লাসে বুঝি নাই।
কাউকে হেল্প করতে পারলে আমি তখন খুব খুশি হতাম। স্বভাবটা পেয়েছিলাম বাবার কাছ থেকে। তাই খুব আনন্দের সঙ্গে আমার বন্ধুকে উপপাদ্য বোঝাতে বসলাম। হঠাত্ খেয়াল করলাম বন্ধুটি হাত কচলাচ্ছে আর অন্যমনস্ক হয়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বুঝতে পারছ না? ও দাঁড়িয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝেছি। যাই আজকে। এই বলে ও চলে গেল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। দুদিন পর আবার এলো। ঐ একই আবদার, উপপাদ্য বুঝতে চায়। বললাম, আমি তো সেদিন বুঝেছিলাম, তুমি না বুঝে চলে গেলে কেন!
ও হাত কচলাচ্ছে। আবার সেই একই ভাব। সেই সময় স্কুলে প্রয়োজন ছাড়া মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের কথা বলা হতো না। তাই আমি ওর প্রয়োজনের কথা ভেবে সিরিয়াসলি পড়াতে শুরু করলাম। আমার বাবা ঐ রুমেই পেপার পড়ছিলেন। কিছু পরে বাবা নামাজের জন্য উঠলেন আর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু আমার দাঁড়িয়ে গেল। উত্তেজিত হয়ে বলল, একজন তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।
আমি তো অবাক! মেজাজ খুব খারাপ হলো। বললাম, আরেকজনের কথা আরেকজন বলবে। তোমার আর কোনো কথা আছে?
সে কিছু না বলে বিদ্যুত্গতিতে বেরিয়ে গেল। তারপর একই কলোনিতে থেকে ওকে আর দেখিনি অনেক দিন। ইন্টারমিডিয়েটের ক্লাস শুরু হয়েছে। ক্লাস সেরে বাসায় আসি, তখন পড়ন্ত বিকেল। সব সময় আমার রুমের জানালায় বসে বিকেলের বাকি সময় পার করতাম। কী অপূর্ব লাগত বাগান, খেলার মাঠ, খোলা আকাশ! সবকিছু ঐ জানালায় বসেই উপভোগ করতাম। একদিন দেখি একদল ছেলে আমার ঐ উপপাদ্য বন্ধুর বাসার দিকে যাচ্ছে। সেখানে একজন ছিল আমার স্কুলের বন্ধু। বাকিদের চিনি না।
পরের দিনও একই দৃশ্য—একদল ছেলে ঐ উপপাদ্য বন্ধুর বাসায় যাচ্ছে। এক মিনিট না যেতেই আবার বেরিয়ে গেল!
এর দুই বছর পরের ঘটনা। বিকেলে উপপাদ্য বন্ধুর বাসায় যাওয়া গ্রুপের সেই স্কুলবন্ধুর সঙ্গে হঠাত্ দেখা হয়। স্কুলে থাকতে ছেলে-মেয়েতে কথা বলার যে জড়তা ছিল, তখন আর সেটা নেই। হাই-হ্যালো হলো। কথা হলো টুকটাক। একপর্যায়ে বলল, তোমার সঙ্গে তো আগে ভয়ে কথাই বলা যেত না।
খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভয়ে? কেন, ভয় কেন?
ও বলল, আমি একা না, সবাই ভয় পেত।
কেন? বলো তো শুনি!
স্কুলবন্ধুটি তখন বলতে শুরু করল একটা দিনের ঘটনা: একদিন আমি তোমার কলোনির বন্ধুকে তোমার বাসায় পাঠিয়েছিলাম আমার কথা বলার জন্য। ও দুইদিন গিয়েও কিছু বলতে পারে নাই। তারপর দুই বছর পর আমার কলেজের বন্ধুরা ঘটনা শুনে আমার ঐ কলোনির বন্ধুর উপর চড়াও হলো, বলল, তোকে সাহস করে বলতেই হবে। কারণ তুই কলোনিতে থাকিস। যাওয়ার সুযোগ তোরই আছে।
উপপাদ্য রাজি হয় না, আবার না হয়েও পারে নাই। নিমরাজি অবস্থায় বাসায় ফেরে। ওকে কড়াভাবে শাসানো হয়, পরদিন বিকেলে রেজাল্ট নিতে আসব। পরদিন বিকেলে আমরা বন্ধুরা যাই কলোনির বন্ধুর (উপপাদ্য বন্ধু) বাসায়। নক করতেই ওর মা দরজা খুলে দিলেন। আমাদের দেখে বললেন, ‘তোমাদের বন্ধু তো বাসায় নাই। কী হয়েছে কী জানি! গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পর থেকে দেখি মুখ কালো করে বসে আছে। আজ দুপুরে বলে মা, নানার কথা মনে পড়ছে খুব। দেখে আসি নানাকে। এই বলে সে তার নানাবাড়ি চলে গেছে।’
কী অবস্থা চিন্তা করো! তোমার কাছে আসতে হবে ভেবে সে শহর ছেড়ে পালিয়েছে!
ঘটনা মনে পড়তেই বেশ আনমনা হয়ে গেলাম। বুঝলাম না, তখন আমি বাঘ নাকি ভাল্লুক ছিলাম!
