করোনার প্রভাব

ক্ষতিগ্রস্ত রমজান ও ঈদের অর্থনীতি

আপডেট : ১৫ মে ২০২০, ২১:০৪

এম. এ. মাসুম

এ বছর রমজানে ঢাকা শহরসহ সারাদেশের হাটবাজারগুলো যেন খা খা করছে। নেই কোনো রমজান কেন্দ্রিক কোলাহল, কেনাকাটার ব্যস্ততা। এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের বহু প্রতিক্ষীত মহাআনন্দের দিন “ঈদুল ফিতর” আসে। ঈদ সারা বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দঘন দিন।

প্রবাসীরা ঈদ উপলক্ষ্যে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়ে থাকে। বিভিন্ন ব্যাংকগুলো তাদের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোয় উত্সাহিত করার জন্য গ্রাহকদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ চালু করে থাকে। অন্যদিকে পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও পণ্যসামগ্রী উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তাদের বিপুল পরিমাণ ঋণ দেয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব অর্থ প্রবাহ চলে যায় ঈদ বাজারে। ঈদে সব বয়সি মানুষই নিজেকে পরিপাটি ও সুন্দরভাবে তুলে ধরার জন্য চেষ্টা করে। ঈদে চাই নতুন জামা-কাপড় সে সঙ্গে নতুন আসবাবপত্র ইত্যাদি। তাই সব সময় ঈদকে সামনে রেখে ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠে দেশের বিভিন্ন শপিংমল, বিপণিবিতান এমনকি ফুটপাথও। ঈদের মাসে যেমন সারাদেশের শপিংমল বা মার্কেটগুলো গতিশীল হয় সেসঙ্গে সারাদেশের কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, দেশীয় বুটিক হাউজগুলোতেও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে এবং বাড়ে আর্থিক লেনদেন। 

ঈদের ছোঁয়া লাগে গ্রামের ছোটো বাজার থেকে জেলা শহর, বিভাগীয় শহর সব জায়গায়। এসব জায়গায় থাকে উপচে পড়া ভিড়, ব্যস্ত সময় অতিক্রম করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। ক্রেতারা দৌড়াতে থাকে এক বাজার থেকে আরেক বাজারে। বিক্রেতারাও নির্ঘুম সময় অতিক্রম করেন ক্রেতাদের পছন্দমতো পণ্য সরবরাহ করার জন্য। উচ্চবিত্তের ক্রেতারা ছুটে বেড়ান ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, আমেরিকার নামিদামি মার্কেটগুলোতে।

এ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা এবং যান চলাচল। স্থবির হয়েছে দেশের অর্থনীতির চাকা। স্মরণকালের ভয়াবহ ধস নেমেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। বন্ধ হয়ে গেছে রমজান ও আসন্ন ঈদ কেন্দ্রিক সমস্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম। প্রতিদিনই আক্রান্তের হার বাড়ছে। ফলে আতঙ্কে নিজ গৃহে বন্দি জীবনযাপন করছেন দেশের ১৬ কোটি মানুষ। স্তব্ধ হয়ে আছে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হাত। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ প্রবাসী। বহু প্রবাসী এরই মধ্যে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন। ফলে রেমিট্যান্সে মারাত্মক নেতিবাচক প্রবাহ দেখা যাচ্ছে।  নোভেল করোনা ভাইরাসের কারণে অবরুদ্ধ অবস্থায় দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ যে সংকটে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে যে দেশে ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে শহরের ৭১ শতাংশ দরিদ্র মানুষের। লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অবস্থা সবচেয়ে সোচনীয়। অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এরাই সবচেয়ে বিপদে পড়বেন।

বিশ্ব বিপর্যয় সৃষ্টিকারী করোনা বাংলাদেশেও ভয়ংকরভাবে এগোচ্ছে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি কত হবে, সেটি এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেছে। তারা গ্রামে চলে গেছেন। যারা ক্ষুদ্র কোনো কাজ করতেন বা কাজের বুয়া, রিকশাচালক, ছোটো ছোটো কারখানার কর্মী, মুদি দোকানের কর্মী, টেইলার্সের কর্মী, বিক্রয়কর্মী এরকম লোকজন। তাদের আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। 

ঢাকা শহরের ব্যস্ত বিপণিবিতানগুলো প্রায় তিন মাস হলো বন্ধ। জানা যায়, ঈদের আগে অধিকাংশ বিপণিবিতান বন্ধই থাকবে। ঈদের আগ মুহূর্তেও ঢাকা শহর বলতে গেলে সুনসান নীরবতা, নেই কোনো কোলাহল। রমজানের আগে বাংলা নববর্ষও পালিত হলো নিস্তব্ধ নীরবতায়। এবছর ঈদের নামাজ একসঙ্গে আদায় করা সম্ভব হবে কি-না এখনো বলা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল লকডাউন পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয় তা নিয়ে। করোনা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি না হলে এবং লকডাউন দীর্ঘায়ী হলে সমস্যা কোথায় পৌঁছাবে সেটাই এখন দুশ্চিন্তার বিষয়। এবছরের ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে অনেকটা নিরবে নিভৃতি।