করোনা ভাইরাসজনিত স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক বিপত্তি ভুগাইতেছে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকেই। ইহা একটি আন্তর্জাতিক বিপর্যয়। বিশ্বের সবচাইতে ধনী, শক্তিশালী ও সক্ষম দেশ যুক্তরাষ্ট্র হইতে শুরু করিয়া আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্বল অর্থনীতির ক্ষুদ্র একটি দেশকেও এখন সকল কিছু বাদ দিয়া করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করিতে হইতেছে। বাংলাদেশও তাহার ব্যতিক্রম নহে। কিন্তু বিগত পাঁচ মাস পূর্বে করোনা নামক ভাইরাস যদি জন্ম না লইত (ল্যাবে তৈরিই হউক আর প্রকৃতিপ্রদত্তই হউক), তাহা হইলে বিশ্বের অপরাপর দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হইতেছিল, জনগণের যে ক্রয়ক্ষমতা বাড়িতেছিল তাহা অব্যাহত থাকিত। তাহারই প্রমাণ মিলিতেছে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির একটি হিসাবে। বৃহস্পতিবার সংস্থাটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানাইয়াছে, দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক ১০ কোটি ছাড়াইয়া গিয়াছে। ইহার মধ্যে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করিতেছেন সাড়ে ৯ কোটি এবং ৮০ লাখ ৮৪ হাজার গ্রাহক রহিয়াছেন ব্রডব্যান্ডের মাধ্যমে। বিষয়টি যথেষ্টই উত্সাহব্যঞ্জক। বাংলাদেশের মোট লোকসংখ্যা কত? ২০১৯ সালের ১৩ জুন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া হিসাব অনুয়ায়ী মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লক্ষ, যদিও উইকিপিডিয়া এবং বেসরকারি হিসাব বলিতেছে ১৮ কোটি। সে যাহাই হউক, এই জনসংখ্যার মধ্যে বড়ো সংখ্যায় রহিয়াছে পাঁচ বত্সরের নিচে বয়সের শিশু, অশীতিপর বৃদ্ধ, হতদরিদ্র এবং অপ্রকৃতিস্থ মানুষ। তাহাদের বাদ দিলে বলাই যায় বাংলাদেশের সকল মানুষই ইন্টারনেট সেবার আওতায় আসিয়াছে। এবং লক্ষণীয় বিষয় হইল, এই ইন্টারনেট ব্যবহার সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে হুহু করিয়া বাড়িয়াছে। টেলিকম-সংক্রান্ত অনলাইন মাধ্যম টেলিকমপেপার জানাইয়াছে শুধু মার্চ মাসেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাড়িয়াছে ৩০ লক্ষ। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশগুলির চাইতে মোবাইল ডাটার মূল্য অনেক চড়া হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে আনুপাতিক হারে ঐসকল দেশের তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখন বেশি। ইহা ছাড়াও দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের গ্রাহকসংখ্যা ১৬ কোটিতে দাঁড়াইয়াছে বলিয়া বিটিআরসি জানাইয়াছে।
ইহাকে আমরা একটি ইনডিকেটর হিসাবে ধরিতে পারি। সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে প্রায় সকল খাতেই বাংলাদেশ অপরাপর দেশগুলির তুলনায় দ্রুত আগাইতেছিল। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিষয়ক সংস্থা, থিংকট্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনের প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালে অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বাধিক হইবে বলিয়াও ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিল। কিন্তু এই লকডাউনের ভাইরাস কোথায় নিয়া যাইবে আমরা জানি না।
যেই বাংলাদেশে একসময় বহু মানুষের পরনে কাপড় ছিল না, দুই বেলা খাবার জুটিত না, সেই বাংলাদেশে এখন পোশাকের অভাবে থাকা কোনো লোক নাই। এই করোনার চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনা মানুষ না-খাইয়া আছে বলিয়া আমাদের কাছে খবর নাই। যোগাযোগব্যবস্থায় প্রায় বিপ্লব ঘটিয়া গিয়াছে। যেই পথ পাড়ি দিতে দিন পার হইয়া যাইত, সেই পথ এখন চার ঘণ্টায় আমরা পার হইতে পারি। ইহা কম অর্জন নহে। এই ভাইরাসের বালাই শিগিগরই কাটিয়া যাইবে, আবার আমরা গতি ফিরিয়া পাইব—এই প্রত্যাশাই আমাদের সকলের।
