মো. জিল্লুর রহমান
সোনালি ব্যাগ হলো পাট থেকে উদ্ভাবিত এক ধরনের পলিথিন ব্যাগ। এটি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। এটি একটি সেলুলোজভিত্তিক বায়োডিগ্রেডেবল বায়োপ্লাস্টিক, যা প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প। পাট থেকে এই সেলুলোজ সংগ্রহ করা হয়, যেখানে পাট হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান আঁশ শস্য।
বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১০ লাখেরও বেশি এবং বছরে প্রায় ৫ লাখ কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর মাত্র ১ শতাংশ পুনঃব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং সমুদ্রে ফেলা হয় ১০ শতাংশ। এসব পলিব্যাগ ১০০ বছরেও পচে না ও মাটির সঙ্গে মেশে না, যার ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার মানুষ ছাড়াও বিপুলসংখ্যক পাখি ও জলজ প্রাণী। বাংলাদেশে ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন ব্যাগ উত্পাদন, বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু দামে সস্তা ও বিকল্প না থাকায় নানা সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বর্জ্য পদার্থ রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে উত্পাদিত পলিথিন ব্যাগ শুধু খাদ্যসামগ্রীকেই বিষাক্ত করছে তা নয়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে শহরগুলোতে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে তার প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ জমা হচ্ছে। ব্যবহূত পলিথিন গলিয়ে আবার ব্যবহার করায় এতে রয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল, যা থেকে ক্যান্সার, চর্মরোগ, লিভার, কিডনি ড্যামেজসহ জটিল রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসার মতে, শুধু ঢাকায় ১০০ কোটি পলিথিন ব্যাগ ভূপৃষ্ঠের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে মাটির নিচেও সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন স্তর, যা ভূপৃষ্ঠে স্বাভাবিক পানি ও অক্সিজেন প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে জমির শস্য উত্পাদন ক্ষমতা ধ্বংস করছে। একইসঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করে তোলার নেপথ্যে রয়েছে পলিথিনের অবদান। এসব ক্ষতি বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্যশস্য ও চিনি মোড়কীকরণের জন্য পরিবেশবান্ধব পাটের বস্তা বা থলে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
বর্তমানে আমাদের দেশে উত্পাদিত পাটের পুরোটা এ খাতে বিনিয়োগ করলে তা বিশ্ব চাহিদার এক তৃতীয়াংশ পূরণ করবে। অভ্যন্তরীণভাবে পাট আঁশের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে পাটের ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তির পাশাপাশি পতিত জমিও পাট চাষের আওতায় এনে পাট খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হবে।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যাগ বিশ্বজুড়ে যখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন পাটের এই প্রাকৃতিক পলিব্যাগ বিশ্বের পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়তা করবে। দেশীয় চেইন শপগুলো এই সোনালি ব্যাগ ব্যবহার করতে আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে এর বিপুল চাহিদা পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে বছরে ৫০০ বিলিয়ন পচনশীল পলিব্যাগের বৈশ্বিক চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে পাটের সোনালি ব্যাগ উত্পাদন করতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকেও উত্সাহিত করতে হবে। সোনালি ব্যাগ দামে সাশ্রয়ী হলে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে। রক্ষা পাবে আমাদের পলিথিন ব্যাগে কলুষিত পরিবেশ।
ঢাকা
