সাধন সরকার
এ বছর এপ্রিল মাস থেকেই বজ্রপাতের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়েছে। সবে কালবৈশাখীর মৌসুম শুরু! পুরো বর্ষা মৌসুম তো এখনো বাকি। কৃষক ও জেলেদের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ বললে প্রথমেই আসবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা। তাছাড়া পরিবেশদূষণ, বৃক্ষসম্পদ ধ্বংস, নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ তো রয়েছেই। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তন বজ্রসহ ঝড়-বৃষ্টির জন্য বেশি দায়ী। এপ্রিল-মে মাসেই ঝড়-বৃষ্টিসহ বজ্রপাত বেশি দেখা যায়। কেননা এ সময় বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরের হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে ব্যাপক বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তাল, নারিকেল, বট ও সুপারিসহ বড়ো বড়ো গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নেয়। ফলে বজ্রপাত হলেও মানুষ বেঁচে যায়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বড়ো বড়ো গাছ কমে যাওয়াসহ কৃষিতে যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও মুঠোফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি বজ্রপাতকে যেন স্বাগত জানাচ্ছে! বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মারা যায় কৃষক ও জেলে। এই দুই জনগোষ্ঠীকে বজ্রপাতের মৌসুম শুরুর আগে থেকেই সচেতন করা হলে বজ্রপাতে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এপ্রিল বা এর আগে-পরের সময়টাতে বজ্রপাতে মৃত্যু ঘটবে এটা তো কয়েক বছর ধরেই নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে! কৃষক খেতে কাজ করবে, জেলে মাছ ধরবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ঝড়-বৃষ্টির ঐ সময়টুকুতে কৃষক-জেলেরা যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে সে ব্যাপারে যেসব এলাকায় বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে সেসব এলাকায় জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার।
বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে তালগাছ লাগানো একটা ভালো সমাধান। তবে এটা বেশ সময়সাপেক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। প্রযুক্তিগত সহায়তার কথা এক্ষেত্রে ভাবা যেতে পারে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন প্রযুক্তির কথা আলোচনা হচ্ছে। এর একটি হলো, বজ্রপাত অঞ্চলে মুঠোফোনের টাওয়ারে লাইটেনিংয়ের স্টোর লাগিয়ে ঝুঁকি কমানোর বিষয়টি। বলা হচ্ছে, হাওর-বাঁওড় এলাকার ফসলের মাঠে নির্দিষ্ট দূরত্বে পরপর এই যন্ত্র বসালে বজ্রপাতে মৃত্যুহার অনেক কমবে। কোথায় কখন বজ্রপাত হতে পারে, ঐ প্রযুক্তির সাহায্যে ৪০ মিনিট আগেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় মুঠোফোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানা সম্ভব! ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহ বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর এই ‘লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর’ কাজে লাগাচ্ছে। যদিও এই প্রযুক্তিতে ব্যয় একটু বেশি! বজ্রপাত যেহেতু প্রাকৃতিক এটা হবেই, তবে কম অথবা বেশি। বজ্রপাত রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণই বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা যেতে পারে। শহরে ও গ্রামে বিল্ডিংয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড বা বিভিন্ন স্থানে ধাতব টাওয়ার বসানোর মাধ্যমেও বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ আহত ব্যক্তিদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
ঢাকা
