মোহাম্মদ নাসিম
১৭ মে ১৯৮১। প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঝড় উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ সেদিন ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সমবেত হয়েছিল আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে একনজর দেখার জন্য এবং তার সব হারানোর বেদনার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করার পরে শুধু বাঙালি নয়, বিশ্ববাসী চমকে উঠেছিল— কীভাবে কয়েক জন বিশ্বাসঘাতক বাঙালি হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনককে হত্যা করতে পারে। সেদিন বাঙালি হারিয়েছিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে।
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা হারিয়েছিলেন তাদের প্রিয়তম পিতামাতাসহ ভাই-স্বজনদের। এই প্রচণ্ড ব্যথা-বেদনা বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেদিন শুধু নিজে অঝোরে কাঁদেননি সমগ্র বাঙালি জাতিকে অঝোরে কাঁদিয়েছেন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সেই বর্ষণসিক্ত মুহূর্তে।
৭৫-পরবর্তী আওয়ামী লীগ ছিল দ্বিধাবিভক্ত, নির্যাতিত-নিষ্পেষিত একটি রাজনৈতিক দল। এর লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ও সমর্থক সেদিন বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল দলের সদ্যনির্বাচিত সভানেত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে। এর কিছুদিন আগেই ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই কাউন্সিলে অনেক আলাপ-আলোচনার পরে নেতৃবৃন্দ ও কাউন্সিলররা সর্বসম্মতিক্রমে দিল্লিতে প্রবাসী শেখ হাসিনাকে দলীয় সভানেত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান এবং তরুণ নেতৃত্ব আন্তরিকভাবেই শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী করে দলের অবশ্যম্ভাবী ভাঙন রোধ করেছিলেন এবং দেশের জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরশাসক ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার দীপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।
সেই দুঃসহ যাত্রাপথের কান্ডারি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেদিন বর্ষণসিক্ত মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখ লাখ জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণা দিয়েছিলেন। একদিকে সব হারানোর বেদনা অন্যদিকে সাহস ও কঠিন সংগ্রামের দীপ্ত কণ্ঠস্বর সেদিন দল এবং জনগণকে এক আশায় উদ্দীপ্ত করেছিল। আমরা সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সেই সাহসী প্রতিচ্ছবি যেন দেখেছিলাম।
এরপরের ইতিহাস দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নিরন্তর গণতন্ত্র উদ্ধারে শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সুন্দরবন থেকে পাথুরিয়া বাংলার এমন কোনো গ্রাম-জনপদ নেই, যেখানে শেখ হাসিনা ছুটে বেড়াননি জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে। সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে কয়েক যুগ গণতন্ত্রের জন্য, বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামিদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে এবং ভেঙে পড়া জাতিকে সংগ্রামের এক কাতারে আনতে ঘুরে বেরিয়েছেন। শেখ হাসিনাসহ আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী কারারুদ্ধ হয়েছেন, নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছেন কিন্তু রাজপথ থেকে লড়াইয়ের মাঠ থেকে পালিয়ে যাননি। এর মধ্যে কিছু বিভ্রান্ত ও দিকভ্রষ্ট নেতা পথচ্যুত হয়েছে ঠিকই কিন্তু মূল সংগঠন ও কর্মীরা শেখ হাসিনার পাশে থেকে তাকে সাহস জুগিয়েছেন। তার চলার পথে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।
আজকে প্রায় ৪০ বছর পরে সবাই উপলব্ধি করবে একাশি সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগ ও দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করা কতখানি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইতিহাস বলবে, ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে একাশি সালের ১৭ মে বাঙালির ভাগ্য নির্ধারণের আরেকটি মাইলফলক।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে পরাজিত শক্তি দেশে গণতন্ত্রবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার অপরাজেয় সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে যেন নতুন করে উপস্থিতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিজয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। শেখ হাসিনা জনগণের নেতৃত্ব এবং দেশের শাসনভার একাধিকবার গ্রহণ করে প্রমাণ করেছেন, এদেশে জাতির জনকের হত্যাকারীদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচার সম্পন্ন করা এবং অধিকাংশের দণ্ড কার্যকর করা ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার অসম্ভব কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব।
তৃতীয় বিশ্বে একমাত্র শেখ হাসিনাই চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে একটি দলকে সুসংগঠিত করে হতাশাগ্রস্ত জাতিকে সাহসী এবং অবিরাম লড়াই করার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন। স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনকে গণতান্ত্রিক পথে পরাজিত করে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় বারবার আনা যায়, তা তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন।
আজকের বাংলাদেশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এখনো স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। যে বাংলাদেশ ছিল একদিন অনাহার ও ক্ষুধার্তের দেশ, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, সেই বাংলাদেশে আজকে অনেক উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্যকে পরাজিত করছে। স্বাস্থ্য শিক্ষাসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। সীমাবদ্ধ সম্পদের দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু শেখ হাসিনার সাহসী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে আমরা অদূর ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি।
বঙ্গবন্ধুর মতোই শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবল, পরাজয় না-মানার কঠিন মানসিক শক্তি এবং ধৈর্য ও সহনশীলতা তাকে আজকে বিজয়ের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যে কারণে আজকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দিনটি গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির প্রতিটি মুহূর্তের জন্য স্মরণীয় ও প্রাসঙ্গিক। আজকের দিনে নেত্রী শেখ হাসিনাকে সশ্রদ্ধ সালাম।
লেখক : আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য
সমন্বয়ক, কেন্দ্রীয় ১৪ দল
