করোনা পরিস্থিতিতে যৌনকর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন

আপডেট : ১৭ মে ২০২০, ২১:৪৪

 ‘এই পরিস্থিতিতে তারা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। যেসব যৌনপল্লি ত্রাণ

পাচ্ছে সেখানেও  প্রভাবশালীদের জন্য ত্রাণের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। তাদের

পুনর্বাসনে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।’

ইত্তেফাক রিপোর্ট

 করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যৌনকর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজ্ঞজনেরা। তারা বলেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের জীবিকা পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু জীবিকা পরিবর্তন আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় সহজ নয়। তাই তাদের পুনর্বাসনে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। উন্নয়ন সংগঠন লাইট হাউজ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা।

ঢাকার বনানী কার্যালয় থেকে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে লাইট হাউজের প্রধান নির্বাহী মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, দেশ জুড়ে কার্যত লকডাউনের পর থেকে যৌনপল্লিসহ রাস্তা, বাসা ও হোটেলভিত্তিক নারী যৌনকর্মী এবং পাশাপাশি পুরুষ ও হিজড়া যৌনকর্মীদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যৌনকর্মীরা আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। করোনা পরিস্থিতিতে যৌনকর্মীরা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। যেসব যৌনপল্লি ত্রাণ পাচ্ছে সেখানেও প্রভাবশালীদের জন্য ত্রাণের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। যৌনকর্মীরা যেন কোনো প্রকার ত্রাণ থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখা এবং ত্রাণের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সেই সঙ্গে যৌনকর্মীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কষ্ট লাঘবের লক্ষ্যে সরকারসহ বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও মানবতাবাদী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার কথাও বলেন তিনি। এসময় সেক্সওয়ার্কার নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক আলেয়া আক্তার লিলি যৌনকর্মীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। উল্লেখ্য, লাইট হাউজের প্রতিষ্ঠাকাল হতে দেশের গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র মানুষের সহযোগিতার পাশাপাশি প্রান্তিক ও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী, যৌন সংখ্যালঘু, হিজড়া, আদিবাসী এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে।

মূল বক্তব্যে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো যৌনপল্লি দৌলতদিয়ায় একজন যৌনকর্মীর এক দিনে সর্বনিম্ন ব্যয় ৫৪০ টাকা। মাসে ১৬,২০০ টাকা। যার ঘর ভাড়া বেশি তার খরচও বেশি। এই মুহূর্তে যৌনকর্মীদের কোনো আয় নেই কিন্তু প্রতিটি খরচ তাদের বহন করে যেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এক বেলা খাবার জোগাড় করার মত সামর্থ্য যৌনকর্মীদের নেই।

লাইট হাউজের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী যৌনপল্লিনির্ভর যৌন পেশায় নিয়োজিত নারীর প্রতি সহিংসতার রিপোর্ট মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫৬ শতাংশ। কারণ অনুসন্ধান করতে দেখা গেছে, এই যৌনকর্মীরা তাদের বাবু (ভালোবাসার মানুষ) দ্বারা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। যৌনকর্মীরা একই সঙ্গে তাদের পল্লির সরদার এবং বাড়িওয়ালাদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে এবং নিজেরা নিজেরাই সহিংস আচরণ করছে।  অন্যদিকে ৬৪৭ জন ভাসমান যৌনকর্মী খদ্দের, স্থানীয় মানুষ, মাস্তানসহ বিভিন্ন লোকজনের কাছে হয়রানি এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। বিগত মাসগুলোতে এই হয়রানি ১০০-১৩০ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০২০ সালের এপ্রিলে তা বৃদ্ধি পেয়ে পাঁচগুণ হয়।

১১টি যৌনপল্লির মধ্যে দৌলতদিয়া যৌনপল্লির এক জন যৌনকর্মী গত ২৪ এপ্রিল কোভিড-১৯ সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তার নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ বলে জানা যায়। মৃত্যুর পর তার আশপাশের ঘরসমূহ লকডাউন করা হয়। এখনো পর্যন্ত দৌলতদিয়া যৌনপল্লিসহ অন্য কোনো যৌনপল্লিতে নতুন কোনো সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই ঘটনার পর দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে নতুন কারো নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে যৌনকর্মীদের ভোটার আইডি নিশ্চিত করার বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়।  সংবাদ সম্মেলনে ইউএনএইডসের প্রতিনিধি ডা. সায়মা খান, ইউএনএফপির প্রতিনিধি ডা. রাহাত আরা নূর, সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের এইচআইভি এইড প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি, ডা. লিমা রহমান, সংবাদকর্মী এবং লাইট হাউজের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।