করোনায় মানসিক চাপ ও উত্তরণের পন্থা

আপডেট : ১৮ মে ২০২০, ২১:৪০

এস এম খালিদ হোসেন

পুরো বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো আতঙ্কের নাম আজ করোনা। এই করোনা থামিয়ে দিয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রায় সব কয়টি পথ। অচেনা-অজানা, অদৃশ্য এক শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছি আমরা। এটা গোটা মানব জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন—করোনা জিতবে, নাকি মানুষ জিতবে? সবার মনেই অজানা শঙ্কা, একধরনের ভীতি। নিজের জন্য, প্রিয়জনদের জন্য, সেই সঙ্গে পুরো মানব জাতির জন্য রয়েছে উদ্বিগ্নতা। কেউই জানি না কী রয়েছে সামনের দিনগুলোতে, কোন পথে হাঁটছি আমরা, কোথায় আমাদের গন্তব্যস্থল।

সবাই যখন আমরা কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন কতটুকু? আমি বলব, হ্যাঁ, অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কারণ মনোবিজ্ঞানীদের মতে একজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা মানেই কিন্তু সার্বিক সুস্থতা নয়। সার্বিক সুস্থতার জন্য শারীরিক ও মানসিক উভয় সুস্থতারই সমন্বয় প্রয়োজন। একজন মানুষের শরীর ও মন একে-অপরের পরিপূরক।

যে-কোনো সংক্রামক রোগের মহামারির সময়ে, নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দাদের মানসিক প্রতিক্রিয়া সেই রোগের বিস্তার এবং সংবেদনশীল যন্ত্রণা সংঘটিত হওয়ার পেছনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহামারিটি পুরো সময়কালে এমনকি প্রাদুর্ভাবের পরেও বিভিন্ন সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। সারা দুনিয়ায় চলছে মহামারি করোনার এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। এই অস্বাভাবিক সময়ে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। করোনা মোকাবিলার অংশ হিসেবে আমরা সবাই এখন গৃহবন্দি হয়ে সময় পার করছি। থেমে গেছে করোনা-পূর্ববর্তী আমাদের শত-হাজারো ব্যস্ততা। হয়ে পড়েছি সবাই কর্মহীন। পেয়ে গেছি অফুরন্ত অবকাশ। মনের আকাশে ভিড় জমিয়েছে একঘেয়েমি, বিরক্তি ও বিষণ্নতার কালো মেঘ। সেই সঙ্গে যুক্ত  হয়েছে আতঙ্ক, ভয়, প্রিয়জন হারানোর অজানা আশঙ্কা। সামাজিকভাবে মর্যাদা ক্ষুণ্নের আশঙ্কা ও কোভিড-১৯-এ সংক্রমিত রোগীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্থ মানুষের মানসিক চাপ সৃষ্টির পেছনে অনেকাংশেই দায়ী। একদিকে জীবন-জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে দূরত্বের নিয়ম মেনে ঘরে থাকতে গিয়ে মনের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। এই যখন অবস্থা, তখন অনেকেই আমরা এই মানসিক চাপ নিতে পারছি না। অতিরিক্ত চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ছি আমরা অনেকেই। মানসিকভাবে যারা খুব চাপে ভুগছি, তাদের নিয়ে বাড়তি চিন্তা যোগ হচ্ছে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই সময়ে মানসিক চাপ কমাতে না পারলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমবে আর চিন্তাভাবনা এলোমেলো হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য সতর্কতাও ঠিকমতো মানা সম্ভব হয়ে উঠবে না। 

তাহলে এই দুর্যোগকালীন আমাদের কী করণীয়? মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শের আলোকে কিছু বিষয় উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি : মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করি এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। যে সব ব্যক্তি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই, সাহায্যের হাতকে প্রসারিত করি এবং সামাজিকভাবে তারা যেন কোনোভাবেই বয়কটের শিকার না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি। কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যারা জয়ী হয়েছেন, এমন সাহসী লোকদের বিষয়ে জানার চেষ্টা করি, তাদের অভিজ্ঞতা শুনি এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আমাদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করি।   

যতটা সম্ভব কোভিড-১৯-এর বিষয়ে কম দেখি, কম শুনি, কম পড়ি ও কম আলোচনা করি। কারণ এতে আমাদের আরো বেশি আতঙ্কিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আসুন নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলি আন্তরিক সম্পর্ক। চারপাশে আমাদের অনেক প্রিয়জন থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখি। ফোন কলে, খুদে বার্তায়, ই-মেইল, ফেসবুকে বা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখি। তাদের অভয় দিই। আন্তরিকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলি, খোঁজ-খবর রাখি। নিজেদের কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য আনি। একঘেয়েমির সময়গুলোতে ধর্মীয় বই-পুস্তক, গল্প, উপন্যাস পড়ে সময় কাটাই।  জীবনের একটি সুশৃঙ্খল রুটিন তৈরি করি এবং পরিমিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলি। প্রতিদিন কিছু সময় হালকা শারীরিক ব্যায়াম করি।

পরিশেষে বলতে চাইছি, জীবন মানেই যুদ্ধ। যুদ্ধ করেই মানুষ কালে কালে বেঁচে ছিল, আছে ও থাকবে। সংকট  চিরস্থায়ী নয়। দুর্যোগঘন এই সময়ে মনোবল না হারিয়ে ধৈর্য ধরে মোকাবিলা করতে পারলেই আমরা করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করে বিশ্বকে করোনামুক্ত করতে পারব। রাতের এই কালো অন্ধকার বিদীর্ণ করে দেখা দেবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সূর্যের পরিষ্কার আভা। সবার সুস্থতা কামনা করছি। ভালো থাকুক প্রিয় মাতৃভূমি, মাতৃভূমির মানুষ ও বিশ্ববাসী।  

লেখক :শিক্ষক ও গবেষক, আর্মি আইবিএ সাভার (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস)