ঈদের বাকি আর এক সপ্তাহেরও কম। বেতন-বোনাস ইস্যুতে শিল্পাঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরেই শ্রম অসন্তোষ চলছে। এই অসন্তোষ কমার লক্ষণ নেই, বরং ঈদ সামনে রেখে আরো বাড়ছে। শিল্পাঞ্চল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গতকালও শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৫০টি কারখানায় শ্রম অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল অনেক কারখানার শ্রমিকদের বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও বেতন না পাওয়ায়, সরকার ঘোষিত অর্ধেক বোনাস প্রত্যাখ্যান করে পূর্ণ বোনাস দেওয়ার দাবিতে বেশিরভাগ কারখানায় আন্দোলন হয়েছে। এছাড়া কোন কোন কারখানার শ্রমিকরা চলতি মাসের অর্ধেক বেতনের দাবিতেও আন্দোলন করেছে। গতকাল পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি কারখানায় এপ্রিলের বেতন হয়নি। অন্যদিকে গার্মেন্টসহ অন্যান্য খাতের মিলিয়ে শিল্পাঞ্চল পুলিশের কাছে তালিকাভুক্ত আরো প্রায় ৩৫০ কারখানা মার্চের বেতনও পরিশোধ করেনি।
শিল্পাঞ্চল পুলিশের এসপি মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে কেবল শিল্পাঞ্চলেই ৫০ এর অধিক কারখানায় অসন্তোষ হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বাইরে টুকটাক অবরোধের চেষ্টা করলেও আমাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে বড়ো ধরনের গোলযোগ হয়নি। বেশিরভাগ শ্রমিক কারখানার অভ্যন্তরেই ছিল। তিনি বলেন, বেশ কিছু কারখানা গত মাসের বেতন শ্রমিকদের বিকাশ অ্যাকাউন্টে আজ (গতকাল সোমবার) পৌঁছানোর কথা ছিল। এমন বেশকিছু কারখানার শ্রমিকদের কাছে টাকা না আসায় তারা বিক্ষুব্ধ হয়েছে। এছাড়া কোনো কোনো কারখানায় পুরো বোনাস এবং কোথাও চলতি মাসের ১৫ দিনের বেতনের দাবিতেও আন্দোলন হয়েছে।
প্রতিবারই ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলে বেতন-বোনাস ইস্যুতে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অতীতের বছরগুলোতে সরকারের কঠোর অবস্থানসহ নানামুখী চাপের কারণে এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। তবে এবার করোনা পরিস্থিতিতে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। একদিকে ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়া অন্যদিকে সংক্রমণ ঠেকাতে কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন পরিশোধের লক্ষ্যে প্রণোদনার অংশ হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ ঘোষণা করে সরকার। ঐ ঋণের আওতায় চলতি মাস থেকে শ্রমিকদের হাতে বেতন পরিশোধ হওয়ার কথা।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঋণখেলাপি, আর্থিক অবস্থাসহ অন্যান্য কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ কারখানা এ সুবিধার বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ঋণের আবেদন করেনি। আবার আবেদন করা কারখানার মধ্যে অনেকেই ঋণ পাননি।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক ইত্তেফাককে বলেন, ঋণ আবেদনের জন্য বিজিএমইএর সনদ নিয়েছে ১ হাজার ৩৭৭টি কারখানা। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ১৫১টি কারখানার ঋণ এখনো অনুমোদন হয়নি। অন্যদিকে বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, তাদের সদস্যভুক্ত চলমান ৮৩৩টি কারখানার মধ্যে ৫১৯টি ঋণের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে ২২টি ঋণ পায়নি।
ঋণ আবেদন কিংবা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা, ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ও কারখানা মালিকদের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, মাসের ১৮ তারিখ পার হলেও তিনটি ব্যাংক এখনো ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। আবার ঠুনকো কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে এসংক্রান্ত ঋণ আবেদনের নথিপত্র গ্রহণ করেনি।
এসব কারণে ঋণ আটকে থাকায় ঈদের আগে অনেক কারখানার পক্ষে এপ্রিলের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ঈদের আগে অনেক শ্রমিকই বেতন পাবে না বলে আশঙ্কা করছি। ফলে অসন্তোষ হতে পারে।
অনেক কারখানায় বেতন না হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন শ্রমিক নেত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বিজিএমইএ আমাদের বলেছিল ২০ মের মধ্যে সমাধান করবে। কিন্তু একটা বড়ো অংশের ঋণের অনুমোদন প্রক্রিয়াই এখনো সম্পন্ন হয়নি। কিছু খেলাপি আছে। সবমিলিয়ে বেশকিছু কারখানার শ্রমিক হয়তো ঈদের আগে বেতন পাবে না।
অসন্তোষ যেসব কারখানায় : গাজীপুর এলাকায় অসন্তোষের তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো এস এফ জিন্স লিমিটেড, কনফিডেন্স টেক্সওয়্যার, ব্রাইট অ্যাপারেলস, হর্নবিল ওয়ান অ্যাপারেল, আলাউদ্দিন অ্যান্ড সন্স, পারি প্রিন্স, গোল্ডেন রেপ্ট আরমেন্স, অ্যাপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং। এছাড়া আশুলিয়া এলাকায় প্রুডেন্ট ফ্যাশন, নাভানা নিট কম্পোজিট, সেতারা গ্রুপ, তিতাস নিটওয়্যার, ফৌজিয়া অ্যান্ড ফাহিম ফ্যাশন, কম্বাইন্ড টেক্স, ইয়াগি বাংলাদেশ লিমিটেড ও মোমো ফ্যাশন। নারায়াণগঞ্জে গ্রাম টেক্স ডায়িং অ্যান্ড ফিনিশিং, উত্তরা জুট অ্যান্ড ফাইবার ও তামাই নিট ফ্যাশন।
