ছাত্ররা পরীক্ষায় ফেল করে কেন?

আপডেট : ১৯ মে ২০২০, ২০:৩৮

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় নানা প্রবন্ধ লিখেছেন। ১৯৫২ সালে সংবাদ-এ ছাপা হয়েছিল তাঁর লেখা: ‘আমাদের শিক্ষা সমস্যা: ছাত্ররা পরীক্ষায় ফেল করে কেন?’ আজ থেকে ৬৫ বছর আগে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী যে সমস্যা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, আজও আমরা সেটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আলবদর, রাজাকাররা যদি তাঁর মতো গুণীজনদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা না করত, কে জানে, আজ হয়তো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা অন্য রকম হতো। আগ্রহী পাঠকেরা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচনাবলী সংগ্রহ করে প্রয়াত এই বুদ্ধিজীবীর লেখাগুলো পড়তে পারেন।

পরীক্ষা পাসের হার যাতে বাড়ে, তার জন্য,সত্যি সত্যি ছাত্র ও শিক্ষকদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। তার জন্য ছাত্ররা ‘সাজেশন’ ও পরীক্ষায় প্রশ্নোত্তর খুঁজতে খুঁজতে প্রাণান্ত এবং শিক্ষকেরাও ‘নিশ্চিত পাস’ (সিওর-সাকসেস) পরীক্ষা সহজ উপায় (মেড-ইজি), পাঠ্য-পুস্তক হজমি (digest) প্রভৃতি পরীক্ষা পাস বটিকা সেবন করিয়ে পরীক্ষা ফেল রোগের উপশমের চেষ্টায় নিয়ত ব্যস্ত রয়েছেন। কাজেই তাঁদের দোষ আর ত্রুটি কোথায়?

আসল ব্যাপারটা হচ্ছে এই, সবাই যেটাকে মহাসমস্যা বলে সামনে দেখতে পাচ্ছেন, সেটা পরীক্ষা, লেখাপড়া নয়। যেন আসল উদ্দেশ্য, কোনোমতে শুধু পরীক্ষাটা পাস করা, লেখাপড়াটা কিছুই নয়। অন্তত সেটি গৌণ। আমাদের মূল ব্যাধি হচ্ছে এইখানে!

ছাত্ররা ও অভিভাবকেরাও হয়তো একটা জিনিস জানেন না যে, ছাত্ররা যত বেশি করে পরীক্ষা পাসের চেষ্টা করে, তত বেশি তারা পরীক্ষা ফেল করে। কথাটা শুনতে উল্টো হলেও সত্যি। কারণ, ছাত্ররা শুধু ‘পরীক্ষার পড়া’ পড়তে গিয়ে জ্ঞানের বিষয় কম পড়ে বা একেবারেই পড়ে না। তাতে করে পরীক্ষার বেলায়ও সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তারা অকৃতকার্য হয়। পরীক্ষার খাতা খুললেই দেখা যায়, শতকরা ৯৫ জন ছাত্রের বেলাতেই অন্য সব প্রশ্নের উত্তর যেমন তেমন কিন্তু রচনা বা essay লেখাতেই একেবারে কুপোকাত। কেননা, রচনাটা নিজে ভেবেচিন্তে লিখতে হয়। তাই শুনলে অবাক হবেন পরীক্ষার আগে ছেলেরা essay- এর বিষয়েও ‘সাজেশন’ চায়। অনেক শিক্ষক অম্লান বদনে বলেও দিয়ে থাকেন।

অর্থাত্ আমাদের ছাত্রদের মধ্যে শতকরা দু-একজন বাদ দিলে স্বীয় চিন্তাশক্তির এত দৈন্য যে, কল্পনা করা যায় না। পড়াটাকে কেবল পরীক্ষামুখী করতে দিয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে না বুঝে ক্রমাগত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার ফলে এই অবস্থা হয়েছে।

এখন আমাদের প্রশ্ন, ছাত্ররা পড়াশোনা না শিখে কেবল পরীক্ষা পাসের জন্য উন্মুখ কেন? তার কারণ, পরীক্ষা পাসের সার্টিফিকেটই আমাদের উপজীবিকার সম্বল, চাকরি বিশিষ্ট বিরাট বিরাট সৌধগুলোর কঠিন লোহার ফটক খোলার একমাত্র চাবিকাঠি। আমাদের বিদ্যা যাচাই করা হয় ্তবিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দ্বারা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতা বিচারেরও সেই একই মাপকাঠি। তাই ছাত্ররাও সব ছেড়েছুড়ে কী করে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, তার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তার ফলে দেখা যায়, বহু ছাত্র এমএ পাস করেছে অথচ কথা বলতে জানে না। ইংরেজি উচ্চারণ তো দূরের কথা, বাংলা সাধারণ শব্দের উচ্চারণ এবং অর্থও ঠিকমতো বলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে এসেছে, অথচ সাধারণ ভদ্রতাবোধ জন্মায়নি, আদব-কায়দা জানে না। কর্তব্যবোধের কথা এই নিদ্রালু, শিথিল দেহ বাংলাদেশে না-ই বললুম। আমার মনে হয়, পরীক্ষা ফেলের চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এইগুলো, আমাদের ছাত্রদের এই অযোগ্যতা।

পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে যত দিন ছাত্রদের মূল্য যাচাই চলবে, ততদিন এমনি অযোগ্য হয়েই গড়ে উঠবে। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে তারা ক্রমাগত এমনি বেশি সংখ্যায় ফেল করতেই থাকবে।     

পরের অংশ শুক্রবার