ঘূর্ণিঝড় আমফান আসিতেছে এই শতাব্দীর সবচাইতে শক্তিশালী রূপে! ইহার শক্তি অতিবিধ্বংসী সিডর কিংবা আয়লার চাইতেও বেশি হইতে পারে। ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত কারণে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড় আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলকে স্থলভাগে প্রবেশের ‘চ্যানেল’ হিসাবে বাছিয়া লইয়া থাকে। ঘূর্ণিঝড় আমফানের গতিপথ বিশ্লেষণ করিয়া আবহাওয়াবিদরা বলিতেছেন, সুপার সাইক্লোনে পরিণত হওয়া আমফানের ব্যাস বেশ বড়ো। ইহা উড়িশার উপকূল স্পর্শ করিয়া উত্তর দিকে সরিয়া পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলে আসিবে। এবং এই ক্ষেত্রে আমাদের সুন্দরবনকে শক্ত ঢাল হইয়া ঘূর্ণিঝড় সামলাইতে হইবে। এক যুগ আগে সিডরের ভয়ংকর আঘাতও সামলাইতে হইয়াছিল সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের কারণেই বহুলাংশে রক্ষা পাইয়াছিল উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষেত্রেও ঢাল হইয়াছিল সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের প্রবল তাণ্ডবের পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক প্রাণহানি হইয়া থাকে। আমফানের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চাইতে ৫ হইতে ১০ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হইতে পারে। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বুধবার দুপুর হইতে সন্ধ্যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি আমাদের উপকূলে আঘাত হানিতে যাইতেছে। এই মুহূর্তে ৭ নম্বর বিপত্সংকেত থাকিলেও পরিস্থিতির অবনতি হইলে বুধবার সকালে মহাবিপত্সংকেত দেওয়া হইতে পারে। এই সংকেত প্রদানের পর বেশি সময় থাকিবে না আর কাউকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার। সুতরাং ইহার অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষজনকে সাইক্লোন শেল্টারে লইয়া যাইতেই হইবে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গত পাঁচ দশকে বিশেষ সক্ষমতা অর্জন করিয়াছে। তবে এইবারের বিষয়টি একটি ভিন্ন। ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি আমাদের মোকাবিলা করিতে হইতেছে করোনা ভাইরাসকেও। এমনিতেই কোভিড-১৯ ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। এই ভাইরাসটি যেহেতু ড্রপলেট, অর্থাত্ হাঁচি, কাশির বা কথা বলিবার সময় এক জনের হইতে অন্যের শরীরে চলিয়া যাইবার ঝুঁকি বেশি থাকে, সেই কারণে ঘূর্ণিঝড়ের জন্য একসঙ্গে অনেক মানুষকে যদি কোনো নির্দিষ্ট শেল্টারে রাখা হয় এবং তাহাদের মধ্যে যদি উপসর্গহীন কোনো সংক্রমিত মানুষ থাকেন, তাহা হইলে সেই ব্যক্তির মাধ্যমে করোনা ভাইরাস অসংখ্য মানুষের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িতে পারে। সেই কারণে সাইক্লোন শেল্টারগুলিতে প্রত্যেককে মুখে মাস্ক ব্যবহার করিতে পারিলে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকিতে পারে। কাহারো মাস্ক না থাকিলে তাহাকে মাস্ক সরববরাহ করা যাইতে পারে। ত্রাণের ক্ষেত্রে ইহাও বিবেচনায় লইতে হইবে। অপরদিকে অসুস্থ মানুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। দেশের ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৫১ লক্ষ ৯০ হাজার ১৪৪ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব। জানা গিয়াছে, করোনার স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া এই সকল আশ্রয়কেন্দ্রে ৪০ শতাংশ লোককে আশ্রয় দেওয়া হইবে। এই নির্দেশও দেওয়া হইয়াছে যে, তাহারা যেন ন্যূনতম এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখেন। তবে ইহাতে অনেকে যেন আশ্রয়কেন্দ্রের বাহিরে থাকিয়া না যায় এবং তাহাতে যেন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়া না যায়—সেই দিকেও লক্ষ্য রাখিতে হইবে। সর্বোপরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে দুই দিকেই নজর রাখিতে হইবে।
