সংকটে অনিঃশেষের গান

আপডেট : ১৯ মে ২০২০, ২১:৩০

আরশিনগর/ বাহারউদ্দিন

১৯৭৮। ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশ বিধ্বস্ত। নিশ্চিহ্ন উপকূলবর্তী আর দ্বীপঘেরা সব লোকালয়। প্রাণহীন হাজার হাজার দেহ ভাসছে, ঘূর্ণির জলে। সমুদ্রতটে গবাদি পশুর লাশের অসাড় মিছিল। এক আকাশ থেকে আরেকটি আকাশে উড়ছে শকুনের পাল। ঠিক ঐ সময়ে, ’৬০ সালে লেখা তার অসমিয়া গানের বঙ্গানুবাদ (বন্ধু পল রবসনের সুরে) কণ্ঠে তুলে অনন্ত বেদনা আর সহানুভূতির আকুতি ছড়িয়ে দিয়ে বিপন্ন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালেন ভূপেন হাজারিকা—‘মানুষ মানুষের জন্যে’। গানের কথা আর মর্মভেদী অভিব্যক্তিতে প্রথমে চমকে উঠল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। পরে বিস্মিত গোটা বিশ্ব। এ তো শুধু গান নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা আর নৈতিকতাময় সহানুভূতির কাঙ্ক্ষিত অঙ্গীকার।

ভূপেন হাজারিকা বেঁচে থাকলে আজকের করোনা আর লকডাউনজনিত সংকটে, নিঃসন্দেহে হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। দুর্গতদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানাতেন নির্বিশেষে। ইউটিউবে, মানুষের সেবাকর্মে, শব্দে নিঃশব্দে কালজয়ী গায়কের কণ্ঠধ্বনি, প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। অনুভব করছি তার উপস্থিতি। প্রজ্ঞার সজল উচ্চারণ যে কত গভীর, কী মর্মস্পর্শী এবং চির প্রাসঙ্গিক তা নতুন করে আমাদের জানার সুযোগ ঘটছে, দেখতে পাচ্ছি তার অনুরণন অসংখ্য ব্যক্তি, সংগঠন আর ব্যবসায়ী সংস্থার নির্মোহ দানের কর্মে ও হূদয়ের ধর্মে।

এই যে উইপ্রোর স্থপতি আজিম প্রেমজি গরিবের সেবা আর সংকট মোকাবিলায় দান করেছেন, ১ হাজার কোটি টাকা, এই যে বিল গেটসও ছড়িয়ে দিয়েছেন তার অকৃপণ সঞ্চয়, এই যে রতন টাটা তার বাইরের ‘আমি’র আবরণ সরিয়ে দিয়ে সমাজের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন ভেতরের বুলন্দ আমিকে; এই যে পতাকা শিল্পগোষ্ঠীর দায়বদ্ধ কর্ণধার মোস্তাক হোসেন কেবল নিজের সংস্থার নয়, সংস্থার বাইরের কয়েক লাখ শ্রমিকের ঘরে ঘরে চাল-ডাল তুলে দিচ্ছেন, নিয়ম মেনে অন্যান্য জরুরি রসদ জোগাচ্ছেন, এসব দৃষ্টান্ত অবশ্য, অতি অবশ্য প্রমাণ করে যে প্রকৃতি যাদের হাতে নেতৃত্বের দায় অর্পণ করে, যে কোনো বিপর্যয়ে তাদের অদৃশ্য মর্মই মুখ্য হয়ে ওঠে এবং কর্ম আর পেশার ব্যাবহারিকতাকে ছাড়িয়ে সে তখন একান্ত মানবিক চেহারা নেয়। এখানেই তার যাপনের সঙ্গে হাত মেলায় সংযম আর অযান্ত্রিকতার সবিনয় প্রতিস্পর্ধা। এখানেই সে সময়কে অতিক্রম করে, সংকটের মুহূর্তে অনিঃশেষ অথবা নিঃসময়ের গান করে।

এক সমাজদরদির সঙ্গে আরেক দরদিয়ার তুলনা হয় না। প্রত্যেকের স্তর ও কাজের পরিধি আলাদা। সামাজিক দায়বদ্ধতার সাম্প্রতিক কাহিনি বলতে গিয়ে বিল গেটস থেকে মোস্তাক হোসেনের কথা বলতে হলো। বিশ্বে এরকম মানুষের সংখ্যা কম নয়। সূর্যালোকের মতো তারা দেশে দেশে ছড়িয়ে আছেন। মোস্তাক অসংখ্যজনের একজন। ঘটনাচক্রে তিনি এই লেখকের একান্ত শুভানুধ্যায়ী। নিখাদ বন্ধু। শুধু কি আমার? না। অসংখ্য মানুষের। যাদের হাহাকার, যাদের কান্না ছুঁয়ে থাকে তার নিত্যদিনের প্রার্থনাকে। যাদের শ্রুত ও অশ্রুত আর্তনাদে মিশে যায় তাঁর দুচোখের অশ্রু। তার নিঃশব্দ সাধনায় সঙ্গী হয়ে ওঠে যেমন জৈব জগত্ তেমনি আশরাফুল মকলুকাত-মানুষ, মানুষ।

আজকের সংকটে বন্ধ তার বহুজাত উত্পাদন। কিন্তু রুদ্ধ নয় সংযম আর কল্যাণের ধারা-উপধারা। পতাকার শ্রমিক-কর্মীর সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। নানা জেলায় ছড়িয়ে থাকা এসব সদস্যের ঘরে ঘরে, অন্যান্য শ্রমিকেরও রাতদিনের খোরাক সরবরাহ করা যে কী কঠিন, আমরা হয়তো তা অনুভব করি, অনুমানও করি। কিন্তু তাড়িত বা প্রাণিত হই কতটা? কেন মহানুভূতির পাশে দাঁড়িয়ে জড়ো করি না সমবেত স্বরকে—মানুষ মানুষের জন্যে!

 অক্লান্ত শিশির আর চার যোদ্ধা

বলিষ্ঠ সাংসদ শিশির অধিকারীর প্রায় বিনিদ্র অবস্থা। জানালেন, রাতে মাত্র আধা ঘণ্টা ঘুমোনোর সময় পাচ্ছেন। সুস্থ, সবল শরীর। বয়স ৮০-এর ওপর। অহর্নিশ খাটতে হচ্ছে, বাড়িতে বাড়ির বাইরে অস্থায়ী শিবির গড়ে। তিনি এবং তার পরিবার অন্ন জোগাচ্ছে অসংখ্য স্থানীয় এবং পরিযায়ী শ্রমিকের। দুই মাস জুড়ে। মহারাষ্ট্র, গুজরাত ও অন্যান্য রাজ্যে উপকূলবর্তী পূর্ব মেদিনীপুরের যেসব শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, অনাহারে অর্ধাহারে যাদের দিন কাটছে, তাদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে শিশিরবাবু এবং তার ছেলে পরিবহনমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, সাংসদ দিব্যেন্দু অধিকারী, বিধায়ক আর কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন্দু অধিকারী, বড়ো ছেলে কৃষ্ণেন্দু অধিকারীর ক্লান্তি উধাও।

নিজের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলেও প্রয়োজনে ঋণ নিয়ে দুস্থের অন্নসেবার দায় পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শিশিরবাবু। অনেক কসরতের পর বৃহস্পতিবার সকালে ফোনে পাওয়া গেল। চারপাশে আব্দারের কলরব। কে কোথায় অসুস্থ, কোন রাজ্যে, কারা কোন জেলায় পড়ে আছেন, প্রবীণ সাংসদকে সব শুনতে হচ্ছে। ঘনঘন ফোনে জবাব দিচ্ছেন। সংযত, প্রত্যয়ে সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর। অতিরিক্ত আবেগ নেই। ঠান্ডা মাথায় অল্পকথায় জানিয়ে দিচ্ছেন, পাশে আছি। ভয় নেই।

সংকটকালীন প্রকট ব্যস্ততা ঘিরে আছে পরিবহনমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। উত্তরবঙ্গ থেকে মালদা-মুর্শিদাবাদ ও জঙ্গলমহল পর্যন্ত ৮ জেলার সাংগাঠনিক দায়িত্ব তার ওপর। অতএব দুর্যোগ মোকাবিলার একক নেতৃত্বও তরুণ মন্ত্রীর কাঁধে। হলদিয়া ও তমলুকের কর্মহীন, ঠিকানাচ্যুত শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভরসা সাংসদ দিব্যেন্দু। বিধায়ক ও কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন্দু ও বাড়ির বড়ো ছেলে কৃষ্ণেন্দু (যার সঙ্গে রাজনীতির সরাসরি যোগ নেই) একইভাবে দুর্গত সেবার নির্মোহ ভাবনায় অঙ্গীকারবদ্ধ। শিশিরবাবু বলেননি, বলেননি তার ছেলেরা। ভিন্নসূত্রে খবর এসেছে, দুই মাস জুড়ে প্রতিদিন ৫ হাজার অসহায়, অন্নহীন, আশ্রয়হীন, কর্মচচ্যুত মানুষকে খাবার জোগাচ্ছে অধিকারী পরিবার।

করোনাজাত মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মুহূর্তে দায়বদ্ধ শিশিরবাবু ও তার ছেলেরা অকাতরে যে নিষ্ঠা যে শ্রম ও ত্যাগ বিলিয়ে দিচ্ছেন, তা আমাদের মনোবলের নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে আলংকারিক, আত্মকেন্দ্রিক ‘সামাজিক দূরত্ব’ নির্মাণ নয়, স্বাস্থ্যবিধির সতর্কতাকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সংযোগে বাড়িয়ে তোলা জরুরি।

তবুও জীবন

অখণ্ড বাঙালির পরমাত্মীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন যে, একসময় আমাদের পথচলা থমকে যায়, জীবন থামে না। এই যে তিনি হঠাত্ চলে গেলেন, ঘুমিয়ে পড়লেন, তাতে কি স্তব্ধ হয়ে গেল তার দিনযাপনের বোধ আর ইহজাগতিকতার আমোঘ অঙ্গীকার। না, স্তব্ধতার প্রশ্ন ওঠে না, কেননা তার মতো মনীষার অনেকানেক ভাবনা, সতর্কবার্তা, সংকটে গম্ভীর ও সজল উচ্চারণ বারবার ফিরে আসবে। বলবে—বিপর্যয় আসে, ইতিহাসের চক্রবৃত্তের গতিতে ঢুকে পড়ে সে মানুষকে তার নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মানুষ বিপদকে ভয় পায়। আবার এই মানুষই দল বেঁধে বিপদ রোখার ডাক দিয়ে পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে জাগিয়ে তোলে বেঁচে থাকা আর জীবধর্মের মিনার। করোনা আর লকডাউনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতাও প্রকারান্তরে আজ আমাদের শিক্ষক হয়ে উঠেছে। তার ধ্বংস, সমস্ত নেতিকে অস্বীকার করে আমরা যেমন লড়ছি, তেমনি পূর্বগামীদের গলায় গলা মিলিয়ে বলতে পারছি, উই আর অন দ্য সেম বুট ব্রাদার্স। কিংবা, উইসেল ওভার কাম, উই ডু বিলিভ। হ্যাঁ আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি যে, অতিমারির পরাজয় আর আমাদের জয় নিশ্চিত। কারো কারো যাত্রা থমকে যাবে হয়তো, জীবন বদলাবে, ছুটতে ছুটতে চলতে থাকবে। প্রবাহ তার শাশ্বত। তার ভেতরে বাহিরে, জলে স্থলে বাস করেন একজন। নাম তার জিন্দারুহ অথবা জিন্দাদিল। আল্লামা ইকবাল তার জাভেদ নামায় এবং রবীন্দ্রনাথ গতিময় জীবনদেবতার ছবি আঁকতে আঁকতে বলে গেছেন যে অনিঃশেষ, তার শুরু নেই। শেষও নেই। সে বেঁচে থাকে। বাঁচিয়ে রাখে অন্যকেও। 

 

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা