সরুগলি আর ছোটো ছোটো ঘর, সেই এক ঘরেই বাস চার থেকে আট জনের। তাদের আসা-যাওয়ার পথে এক জনের সঙ্গে আরেক জনের শরীর লেগে যায়। এক কথায় ঠাসাঠাসি করে বাস করতে হয় রাজধানীর বস্তিবাসীদের। রাজধানীর কড়াইল বস্তি, ভাসানটেক বস্তি, কল্যাণপুর পোড়াবস্তি, মিরপুরের বেগুনটিলা বস্তি, বিএনপি বস্তি, মহাখালীর সাততলা বস্তিসহ সব বস্তিরই একই অবস্থা। করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন এসব বস্তিবাসী।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঝুঁকি কমাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি-সাবানের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নয়তো তাদের মাধ্যমেই ঘটবে সংক্রমণ। তারা বলেন, বস্তিবাসীর বর্তমান যে অবস্থা, তাতে করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন তারাই। তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বস্তিগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাসিন্দারা নিজেদের মতো করেই চলাফেরা করছেন। দলবদ্ধ হয়ে কোথাও কোথাও তাদের গল্প করতেও দেখা যায়। তবে তা মাস্ক ছাড়াই। তারা কেউ বলছিলেন, এসব শহরের রোগ, আমাদের গ্রামে চলে যাওয়াই ভালো। তবে তাদের একটাই কথা, ‘আল্লাহ মরণ কপালে লিখলে মরতে হবে।’ এরই মধ্যে কেউ কেউ গ্রামে চলেও গেছেন।
বস্তিবাসীরা বলছেন, তারা প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ রিকশা চালান, কেউ ভ্যানগাড়ি চালান। কেউ বা দিনমজুর, কেউ গৃহশ্রমিক, কেউ গার্মেন্টসকর্মী। সকাল হলেই তারা কাজের সন্ধানে ছোটেন। দীর্ঘ সময় তাদের কাজ না থাকায় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
বস্তিতে একই সঙ্গে একাধিক ঘরের বাসিন্দাকে রান্না করতে হয়। কাপড় কাচা, শুকাতে দেওয়া, গোসল টয়লেট সবই ব্যবহার করতে হয় একই স্থানে। সুতরাং করোনা ভাইরাস কোনো এক জনের হলে ছড়াতে পারে দ্রুত। মাস্কও ব্যবহার করা সম্ভব হয় না বেশির ভাগ বস্তিবাসীর পক্ষে।
বিএনপি বস্তির বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আমরা সতর্ক আছি কিন্তু বস্তির বেশির ভাগ মানুষ সচেতন নয়। স্যানিটাইজারের ব্যবস্থাও নেই।’ রসুনা খাতুন বলেন, ‘যারা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, তারা অনেক কিছু জানেন, তাদের কাছে আমরা শুনেছি। তবে রাস্তায় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা দেখেছি।’ বস্তিবাসী ও ভাসমান লোক গণনায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী সারাদেশে বস্তির সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৩৫টি। বস্তিতে বসবাস মানুষের সংখ্যা ২২ লাখ ৩২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৪৪ হাজার পুরুষ, ১০ লাখ ৮৬ হাজার নারী এবং ১ হাজার ৮৫২ জন হিজড়া। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১০ লাখ ৬২ হাজার ২৮৪ জন বস্তিতে বাস করে। ঢাকায় বস্তির সংখ্যা ৩ হাজার ৩৯৪টি।
কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওরের (কাপ) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সানিয়াত বলেন, বস্তিতে সরকারিভাবে নজর বাড়াতে হবে। করোনা পরীক্ষার পাশাপাশি কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে তাদের। কারণ বস্তিতে থাকে নিম্ন আয়ের মানুষ। জীবিকার কারণে তাদের ছুটতে হয় কাজে। প্রয়োজনে সরকারিভাবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে।
