একটি রাজকীয় চেয়ার যতই মূল্যবান হউক, উহার চারটি পায়ার যে কোনো একটি হইতে যদি অল্পখানিকটা ভাঙিয়া যায়, তাহা হইলে চেয়ারটি আর কোনো কাজেই লাগে না। পায়ার যেই অংশটুকু ভাঙিয়া পড়িল, সেইটুকুর আয়তন চেয়ারটির সামগ্রিক কাঠামোর তুলনায় হয়তো খুবই কম, তবু পায়ার ঐ অংশটুকুর গুরুত্ব সীমাহীন। উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধের সহিত চেয়ারের এই উদাহরণের সাদৃশ্য রহিয়াছে। যথেষ্ট উঁচু, দীর্ঘ, মজবুত ও টেকসই—এমন একটি বড়ো বেড়িবাঁধের সামান্য একটি অংশ যদি নাজুক হইয়া পড়ে, তাহা হইলে বেড়িবাঁধটি অকার্যকর হইয়া যায়। কারণ ঐ ছোট্ট নাজুক অংশ দিয়াই পানি ঢুকিতে শুরু করিবে। সুতরাং বেড়িবাঁধের শতভাগ সুফল পাইতে হইলে ইহার পুরো অংশকেই অক্ষত রাখিবার বিকল্প নাই।
গতকাল বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়িয়া বহিয়া গেল অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আমফান। এই ঘূর্ণিঝড়ে সবচাইতে বেশি আতঙ্কের মধ্যে রহিয়াছিলেন উপকূলের বেড়িবাঁধ এলাকার মানুষ। কারণ, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী ৫ হইতে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস এবং টানা বৃষ্টি হইলে অনেক বাঁধ ভাঙিয়া পড়িবে। বাঁধের ভেতরের মিঠাপানি লবণাক্ত হইবে। ইহাতে কয়েক মৌসুম সেই সকল এলাকায় ফসল ফলানো কঠিন হইবে। সারা দেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রহিয়াছে। ইহার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলেই রহিয়াছে ৪ হাজার ৭০০ কিলোমিটার বাঁধ। এই সকল বাঁধই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বলা যায় সব জায়গায়ই কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রহিয়াছে। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী খুলনাসহ চারটি উপকূলীয় জেলার ৩৯১ কিলোমিটার বাঁধ নাজুক অবস্থায় রহিয়াছে। আমফানের ভয়ে সেই সকল এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাইয়াছেন। বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ একটা জটিল কাজ। এমন জায়গা আছে যেইখানে স্বাভাবিক জোয়ারেও বাঁধ ভাঙিয়া যায়। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার জোয়ারেও বাঁধ ভাঙে। তাহা ছাড়া, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়েই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এই সকল বাঁধ নামে মাত্র মেরামত করা হয়। আমরা দেখিয়াছি, ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের পর ভাঙিয়া যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হইলেও সেইগুলি বহু ক্ষেত্রেই টিকসই হয় নাই। এখনো পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ হয় নাই ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের। তাহা ছাড়া অনেক বাঁধ দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে।
আমরা জানি, বাংলাদেশের বাঁধগুলি বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা হয়। বাঁধের উপর কাঁচা রাস্তা, ইট বিছানো রাস্তা বা কখনো কখনো কনক্রিট বা পিচের রাস্তা তৈরি করা হয়। এমন বাঁধ যদি নাজুক থাকে, তাহা হইলে ইহার ক্ষতিও বহুমুখী হয়। জোয়ারের পানি ঠেকানোর রিংবাঁধ নির্মাণ, বাঁধ মেরামত, সংস্কার প্রভৃতি নামে প্রতি বত্সর নেওয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। এই সকল প্রকল্পে অর্থ নয়ছয়ের ঘটনাও বিচিত্র নহে। মনে রাখিতে হইবে, পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় বাঁধের নষ্ট হইয়া যাওয়ার ধরন এবং কারণও ভিন্ন ভিন্ন হয়। বাঁধ এই সকল কারণে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় ইহার সময়মতো সুষ্ঠু তদারকি জরুরি।
