সাইফুল ইসলাম হাফিজ
একটি বছর পেরিয়ে ফিরে এলো মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় উত্সব ‘ঈদুল ফিতর’। কিন্তু প্রতি বছরের মতো নয়, এবারের ঈদ উত্সবের স্রোতের প্রবাহ একটু মন্থর। এই উত্সব আমাদের নিকট তখনি আসল যখন করোনা ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বে তিন লাখের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। বাংলাদেশেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, সবার মনে বাসা বেঁধেছে সংক্রমণের শঙ্কা। করোনার আতঙ্কও বিরাজমান, ঈদ উত্সবও কড়া নাড়ছে আমাদের দরজায়; তাই এবারের ঈদ উদ্যাপনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে সবার। আগে জীবন বাঁচাতে হবে। উত্সব এক দিনের হলেও এই দিনকে ঘিরে থাকে অনেক দিনের প্রস্তুতি। যাতে উত্সবমুখরিত দিনটাকে ভালোভাবে উদ্যাপন করা যায়। আসন্ন ঈদকে ঘিরে ইতিমধ্যে সবার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে মরিয়া হয়ে বাজারে ছুটছেন অনেকেই। বাজারের শপিংমলসহ প্রায় দোকানেই প্রতিদিন উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এই ভিড়ের চিত্র দেশের সচেতন মস্তিষ্ককে রীতিমতো হতাশ করছে বৈকি। প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের দরুন বাজার করতে একটু শিথিলতা আসলেও লকডাউন ওঠে যায়নি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে থোড়াই কেয়ার করে, সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তারা বাজারে ছুটছে। দেশের প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের খবর নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। যারা বাজারে যাচ্ছেন, বাজার থেকে করোনা নিয়ে ফিরছেন কি না সে বিষয়টা তাদেরকে মোটেও ভাবাচ্ছে না। মফস্বলের চিত্র আরো ভয়াবহ। বহির্বিশ্বের অবস্থা আরো ভয়ংকর। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে এই খবরও তারা জানে না। অন্য দিকে, বাড়িতে এসে ঈদ উদ্যাপন করতে অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে বাড়ি ফিরছেন। নিয়মিত যানবাহন না পেলেও তারা কাটা লাইনে চলে আসছেন। এসে গ্রামে নিঃসংকোচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোয়ারেন্টাইন বিধি মোটেও মানছেন না। যেটা ঘরের মানুষ, প্রতিবেশী, এলাকার সবার জন্যই বিপজ্জনক। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে কাজ চলছে। ঈদ উপলক্ষ্যে ছুটি হলে সেখানকার কর্মীরাও বাড়িতে আসবে। তখন ভিড় প্রচণ্ডরূপে বেড়ে যাবে। যেটা দেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক হবে। এতদিন যারা ঘরবন্দি থেকেছেন তাদের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে। তাই সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সুযোগ পেলেই যারা সদ্ব্যবহার করতে শুরু করে তাদের জন্য প্রশাসনের দরকার। যে যেখানে আছি সেখানে বসে এ বছরের ঈদ পালন করলে কি কোনো দোষ হবে ? এক বছর ঈদে নতুন জামা না পরলে কি খুব সমস্যা হবে ? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে আমরা যত অবহেলা করব করোনাও তত আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে। আর এভাবেই দিন দিন মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে! যা আমাদের আতঙ্ককে আরো ঘনীভূত করবে। সতর্কতা বিষয়ক আরেকটি বিষয় বলা দরকার। সাধারণত, ঈদের দিন এবং এর আগে-পরে কয়েক দিন থাকে ঈদের আমেজ। ঈদগাহে কোলাকুলি করে ভালোবাসা আদান-প্রদান করা হয়। ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে একে অন্যের বাড়িতে যায়, ঘটে ভ্রাতৃত্বের মহামিলন। কিন্তু এই সংকটময় মুহূর্তের ঈদ একটু ভিন্নভাবে পালন করতে হবে। সকলকে খেয়াল রাখতে হবে আমরা খুব দুঃসময় পার করছি। তাই এবছর অন্যের বাড়িতে না যাওয়াই উত্তম। যেটা উভয়ের জন্যই মঙ্গল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজ বাড়িতে বসে ঈদ পালন করলে সবাই নিরাপদ থাকতে পারব। সতর্কতাস্বরূপ, করমর্দন এবং কোলাকুলি থেকে বিরত থাকাটাই শ্রেয়। বিপদের সময় সতর্ক থাকা বুদ্ধিমানের কাজ তো বটেই ধর্মেরও নির্দেশ আছে। যেহেতু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাতের চেয়ে ঈদের জামাতে মুসল্লিদের সমাগম বেশি হয় সেহেতু অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে নামাজ আদায় করতে হবে। পথেঘাটে ঘোরাঘুরি না করে ঘরে অবস্থান করা করোনা থেকে বাঁচতে প্রয়োজন। এ সময় প্রশাসনের নজরদারি রাখা একান্ত জরুরি। এর পরও যদি আবেগের বশীভূত হয়ে কেউ বাড়িতে এসেই পরে তবে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন এবং তার ব্যবহূত জিনিসপত্রগুলো ধুয়ে ফেললে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা যাবে। তবে আপাতত কারো গৃহে না যাওয়া অনেক ভালো। বাড়িতে যাওয়ার বিপরীতে এবার আমরা মোবাইল ফোনে আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নিতে পারি। তাতে সামাজিকতাও রক্ষা পাবে এবং আমরাও নিরাপদ থাকতে পারব। কারণ, আমরা সবাই-ই অবগত যে আমরা মহামারির মধ্যে দিন পার করছি। তাই আসুন, নিজে ভালো থাকতে এবং দেশকে ভালো রাখতে সতর্ক হয়ে করোনাকালের ঈদ উদ্যাপন করি।
n লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
