উপকূলে আম্ফানের আঘাত

আপডেট : ২০ মে ২০২০, ২২:৫৯

সুপারসাইক্লোন আম্ফান প্রবল গতিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হেনেছে। এর বিস্তার প্রবেশ করেছে বাংলাদেশের সুন্দরবন উপকূলে। গতকাল বুধবার বিকাল ৪টার দিকে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় আম্ফানের অগ্রভাগ আঘাত হানে। এর আগে সকাল ৬টায় মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপত্সংকেত দেখাতে বলা হয়। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনাসহ উপকূলীয় জেলা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ নম্বর মহাবিপত্সংকেতের আওতায় ছিল।

পশ্চিমবঙ্গে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হলেও বড়ো ধরনের তাণ্ডব ও ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। বিশাখাপত্তমে দুর্বল হয়ে দ্রুত সাইক্লোনটি পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এলাকার গঙ্গাসাগর ও বাঁকখালী চরের মাঝ দিয়ে ভূমিতে উঠে আসে। এর ফলে সাইক্লোনটি একটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৬ থেকে ১০ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। হাতিয়ায় জোয়ারের তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে                 লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শরণখোলায়  বেড়িবাঁধ ভেঙে দেড় শতাধিক বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। মনপুরা উপকূলের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল তিন-চার ফুট জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে। পটুয়াখালীতে নৌকা ডুবে ও গাছ ভেঙে দুই জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলার রাঙ্গাবালীর পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক জায়গায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গ্রামবাসী ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামত করছে। এছাড়া পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় দেওয়াল চাপা পড়ে এক শ্রমিক মারা গেছেন।

আবহাওয়া অফিস জানায়, বিকাল ৪টায় খুলনা, সাতক্ষীরা, মোংলা ও সুন্দরবনের একাংশ দিয়ে ঢুকে বাংলাদেশ অতিক্রম শুরু করে আম্ফান। অতিক্রম করতে সময় লাগে চার ঘণ্টা। ঘূর্ণিঝড়টি অতিক্রমের সময় সুন্দরবন অংশে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৬০ কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। রাত ৮টার মধ্যে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চল অতিক্রম করে ঝড়টি। রাত ১১টার মধ্যে স্থল নিম্নচাপ আকারে মেহেরপুর দিয়ে রাজশাহী অতিক্রম করে। ঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঝোড়ো হাওয়াসহ প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অংশেও ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সাইক্লোনটি পূর্ণ জোয়ারের চার ঘণ্টা আগেই ভূমিতে উঠে যাওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে জোয়ারের পানি সর্বোচ্চ ৬ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত অতিরিক্ত উঁচু হয়। সাইক্লোনটি যদি আগের গতিতে আরো দুই ঘণ্টা পরে স্থলভাগ অতিক্রম করত, তাহলে জোয়ারের পানি আরো বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাওছার পারভীন জানান, যতই এই ঝড় উপকূল থেকে ওপরের দিকে এগিয়ে গেছে, ততই শক্তি কমে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে।

২৪ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সরকারের সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে বুধবার বিকেলে সচিবালয় থেকে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। তিনি বলেন, যারা আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন তাদের মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। ভাসানচরের ১২০টি শেল্টারের মধ্যে একটিতে কিছু মানুষকে রাখা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের খোঁজ-খবর রাখতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ‘কন্ট্রোল রুম’ খুলেছে। প্রয়োজনীয় যোগাযোগের জন্য কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন নম্বর হলো ৯৫৪৬০৭২। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম খান এ তথ্য জানিয়েছেন। আগামী ২২ মে রাত ১০টা পর্যন্ত কন্ট্রোল রুম খোলা থাকবে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদের বরাত দিয়ে খুলনা অফিস জানায়, বিকালে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের অগ্রভাগ সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আঘাত হানে। ঐ এলাকায় তখন বাতাসের গতিবেগ ছিল ৬০-৭০ কিলোমিটার। আম্ফানের প্রভাবে মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে খুলনা অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন জানান, খুলনার উপকূলীয় এলাকার ২ লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। তবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর  পাননি তিনি। এদিকে উপকূলীয় দাকোপ ও কয়রা উপজেলার মানুষ বেড়িবাঁধ ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছেন। অনেক জায়গায় মানুষ নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ফাটল মেরামত করছেন।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলায় ঝড়ের সময় নৌকা ডুবে ও গাছ ভেঙে শিশুসহ দুই জন নিহত হয়েছে। সকাল ৮টার দিকে সতর্কতামূলক মাইকিং করে আশ্রয়কেন্দ্রে ফেরার পথে কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ইউনিটের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) টিম লিডার শাহ আলম নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হন। সন্ধ্যায় স্থানীয় একটি খাল থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে এলাকাবাসী। সিপিপির সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া গলাচিপা পানপট্টি খরিদাবাজার এলাকায় বাবার সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময় গাছের ডাল ভেঙে মারা গেছে শিশু রাসেল (৫)। এদিকে অরক্ষিত বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাঙ্গাবালী উপজেলার মাঝের চর, চরআন্ডা, চরমোন্তাজ, চালিতাবুনিয়াসহ পাঁচটি প্লাবিত হয়েছে।

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, সন্ধ্যার দিকে শহরে দেওয়াল চাপা পড়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম শাজাহান মোল্লা (৫৫)। এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে  উপজেলায় সকাল থেকে প্রচণ্ড দমকা বাতাস বৃষ্টি হয়। এতে উপজেলার বলেশ্বর নদ তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল চার-পাঁচ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। বেতমোড় ইউনিয়নের বলেশ্বর নদ মধ্যবর্তী মাঝের চরের বেড়িবাঁধ উপচে হু হু করে পানি ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ট্রলারযোগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মাঝের চরের ১২০ পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনে।

হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান,  দুপুরে হাতিয়া উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তিন-চার ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে করে লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে নিঝুমদ্বীপ, চরঈশ্বর, নলচিরা, সুখচর ও চরকিং ইউনিয়নের শতাধিক কাঁচা ঘর।

শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, সাউথখালী ইউনিয়নে বেঁড়িবাধ ভেঙে  শরণখোলা গ্রামে দেড় শতাধিক বাড়িঘর  প্লাবিত হয়েছে।  প্রায় ২০ হাজার মানুষ চরম ঝুঁকি ও আতঙ্কে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামাসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) জাফর আলম।

বরিশাল অফিস জানায়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে উপকূলীয় এলাকার নদীর পানি। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাভেদ জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জোয়ারে নদ-নদীর পানির উচ্চতা বেড়েছে চার থেকে পাঁচ ফুট। বরিশালের কীর্তনখোলো নদীর পানি বিপত্সীমার দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিভাগে ১০ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছেছে। 

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে সহস্রাধিক কাঁচা বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। হাজারো মাছের ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।  উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। 

মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা উপকূলের নিম্নাঞ্চলসহ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কলাতলীর চর ও চরনিজাম তিন-চার ফুট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। চরনিজাম ও কলাতলীর চরে আশ্রয়কেন্দ্রের সামনে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, নদীতে স্বাভাবিকের চাইতে তিন থেকে চার ফুট পানি বেড়েছে বলে জানান বাগেরহাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদুজ্জামান।

ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভোলা সংলগ্ন মেঘনা তেঁতুলিয়া নদী উত্তাল। পানির উচ্চতা বেড়েছে কয়েক ফুট। অতিরিক্ত জোয়ারে জেলার নিম্নাঞ্চল কয়েক ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। 

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে জেলায় দমকা ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়। জেলার ৯৭৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে ৯০ হাজারের অধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। অতিবর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।

বামনা (বরগুনা)  সংবাদদাতা জানান, জেলায় সকাল থেকে বইছে দমকা হাওয়া এবং মুষলধারে বৃষ্টি। বিষখালী নদীতে দেখা দিয়েছে উত্তাল তুফান। স্বাভাবিক জোয়ারের চাইতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দুই-তিন ফুট। উপজেলার কলাগাছিয়া পূর্ব সফিপুর ও অযোধ্যা গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত করছেন।