ঈদুল-ফিতর: ফাযায়েল ও মাসায়েল

আপডেট : ২১ মে ২০২০, ২১:০২

মুফতি মো.  আবদুল্লাহ্

ঈদ : মাহে রমজানের দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে যে ঈদ অনুষ্ঠিত হয় তাকে ঈদুল ফিতর বলা হয় ; আর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে যে ঈদ হয়ে থাকে সেটিকে ঈদুল আযহা বলা হয়। ঈদ মানে খুশি। ইসলাম ধর্মের বিধানে দুটি ঈদ নির্ধারিত হয়েছে।

তাত্পর্য : হজরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ (র) বলেন, প্রত্যেক জাতি, সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠির নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার, আনন্দ-উত্সব ও জাতীয় দিবস হয়ে থাকে। যেমন : প্রাক-ইসলামী যুগের ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ ইত্যাদি। রাসূল (স) যখন মদীনায় হিজরত করে গেলেন, সেখানে দেখতে পেলেন তারা শিশু-কিশোর, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, নারী-পুরুষ সবাই বছরে দুদিন আনন্দ-উত্সব পালন করে থাকে। সাহাবীদের মধ্যেও তেমন আবেগ আগ্রহ পরিলক্ষিত হওয়ায় মহান আল্লাহ্র নির্দেশে মহানবী (স) ও বাত্সরিক দুটি ঈদ তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা পালনের ঘোষণা প্রদান করলেন (হুজ্জাতুল্লাহিল-বালিগা)।

 রাসূল (স) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাবে, যেদিন সব আত্মা-অন্তর (কিয়ামতের দিন) মারা যাবে সেদিন তার অন্তর মরবে না। অর্থাত্ কিয়ামত দিবসের কঠিন বিপজ্জনক অবস্থা ও মহা-আতঙ্কের মধ্যে যখন সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত ও মৃতপ্রায় হয়ে পড়বে তখন এই ঈদের রাতে ইবাদতকারী বরং হাসি-খুশির মধ্যে কাটাবে (তাবারানী)

ঈদুল ফিতরের সুন্নাত : ঈদুল ফিতরের দিন ১৩টি কাজ সুন্নাত। যথা: ১) শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে যথাসাধ্য সুসজ্জিত হওয়া এবং আনন্দ প্রকাশ করা। ২) গোসল করা। ৩) মিসওয়াক করা। ৪) সাধ্যমতো উত্তম পোশাক পরিধান করা। ৫) সুগন্ধি-আতর ব্যবহার করা। ৬) অতি ভোরে ঘুম থেকে জাগা। ৭) ফজরের পরেই দ্রুত ঈদগাহে যাওয়া। ৮) ঈদগাহে যাওয়ার আগে মিষ্টি দ্রব্য—খেজুর, সেমাই, ক্ষীর ইত্যাদি কিছু আহার করা। ৯) ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সাদকায়ে-ফিতর আদায় করে দেওয়া। ১০) বৃষ্টি-বাদল না হলে ঈদগাহে ঈদের জামাত আদায় করা। ১১) ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তায় ফেরত আসা। ১২) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। ১৩) ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়া-আসার পথে নিচু স্বরে তাকবীর বলতে থাকা অর্থাত্ ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’। পক্ষান্তরে ঈদুল আযহার ক্ষেত্রে কিছুটা উচ্চৈস্বরে পথিমধ্যে বা ঈদগাহে যাতায়াতকালীন তাকবীর বলা সুন্নাত।

  ঈদ ও আল-হাদীস: ১) হজরত আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, মহানবী (স) ঈদুল ফিতরের দিন দুই রাকাত নামাজ পড়লেন। কিন্তু এ দুই রাকাতের আগে বা পরে অন্য কোনো নামাজ পড়েননি (বুখারী ও মুসলিম/মিশকাত: পৃ-১২৬, মূল আরবী (১৩৪৬)

 ২) হজরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা মিনায় অবস্থানের দিনে হজরত আবু বকর (রা) তার নিকট হাজির হলেন। তখন আয়েশার নিকট দুটি বালিকা বসে দফ বাজিয়ে গান করছিল। অপর বর্ণনামতে, বালিকাদ্বয় সেই গান গাচ্ছিল যা আনসারগণ বুয়াস যুদ্ধে প্রেরণা ও উত্তেজনার জন্য গেয়েছিল। তখন নবি (স) নিজ কাপড়ে মুখ আবৃত হয়ে শুয়েছিলেন। হজরত আবু বকর (রা) বালিকাদ্বয়কে ধমক দিলেন। তখন নবি করীম (স) নিজ মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরালেন এবং বললেন, হে আবু বকর! এদেরকে ছেড়ে দাও! (অর্থাত্ করতে দাও) । কারণ এটা ঈদের দিন। অপর এক বর্ণনায় এমনটি রয়েছে, “হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির জন্য আনন্দ-উত্সব, এটা আমাদের আনন্দ উত্সবের দিন।”(বুখারী ও মুসলিম/মিশকাত: পৃ:-১২৫-১২৭, নং-১৩৪৮)

৩) হজরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স), আবু বকর ও উমর সকলেই দুই ঈদের নামাজ খুতবাদানের আগেই পড়তেন। (প্রাগুক্ত, হাদিস নং-১৩৪৪)

৪) হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স) ঈদুল ফিতরের দিন বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদগাহে বের হতেন। (প্রাগুক্ত, হাদিস নং-১৩৪৯)

৫) হজরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত। মহানবি (স) ঈদের দিনে রাস্তা পরিবর্তন করতেন। (প্রাগুক্ত, হাদিস নং-১৩৫০)

৬) হজরত উম্মে আতিয়া (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছিল, আমরা যেন ঋতুমতি মহিলাদের ও পর্দানশিন নারীদেরকে দুই ঈদের দিনেই ঈদগাহে বের করে সঙ্গে নেই ; যাতে তারা মুসলমানদের জামাতে শরিক হতে পারে এবং দোয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। (আরো নির্দেশ) ঋতুমতি মহিলারা যেন নামাজের স্থান থেকে একপাশে সরে বসে। তখন একজন মহিলা আরজ করল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের কারো কারো যে বড়ো চাদর নেই!  (তো পর্দা করে কিভাবে সবাই আসবে?) রাসূল (স) বললেন, তার সহচরী বা সাথি নিজ চাদর (ধার হিসেবে) তাকে পরিয়ে দেবে। (প্রাগুক্ত, হাদিস নং-১৩৪৭)

lলেখক : মুফতি,  ইসলামিক ফাউন্ডেশন,  বায়তুল মোকাররম, ঢাকা