এম. এ. মাসুম
করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব ধরনের ব্যবসায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। সমগ্র অর্থনীতি যেমন বাধাগ্রস্ত তেমনি বিশ্ব পর্যটন প্রায় স্থবির। করোনার কারণে সারা বিশ্বেই ছোটো-বড়ো সব ব্যবসা-বাণিজ্য এখন কল্পনাতীত কঠিন পরিস্থিতির মুখে। অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব পর্যটন। করোনার কারণে লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে অনেক দেশেই হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিমান পরিবহন বন্ধ রয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলায় পর্যটনে ক্ষতি হয়েছিল ৭৭০ কোটি মার্কিন ডলার, অন্যদিকে ২০০২ সালে সার্স ভাইরাসের প্রভাবে এই খাতে ক্ষতি হয়েছিল ৮২০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের কারণে ৩ হাজার কোটি ডলারের লোকসান হতে পারে। ২০১৯ সালে স্পেনে ভ্রমণ করেছে ১ কোটি ৮০ লাখ, চীনে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ও ভারতে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ। করোনা ভাইরাসের কারণে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী হোটেল, রেস্তোরাঁ ব্যবসা সব কিছুই বন্ধ। শাটডাউনে আয় না থাকায় কর্মী ছাঁটাই চলছে হোটেল রেস্টুরেন্ট আর এয়ারলাইন্সগুলোতে। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের হিসেব বলছে, করোনা মহামারির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়বে অন্তত ১০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, ক্ষতির পরিমাণ ছাড়াতে পারে আড়াই ট্রিলিয়ন (আড়াই লাখ কোটি) ডলার।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির ১০ শতাংশই নির্ভর করে পর্যটন খাতের ওপর এবং প্রতি ১০ জনের একজনের কর্মসংস্থান হয় এ খাতে। সম্প্রতি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক বৈঠকে বলা হয়, ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর পর্যটননির্ভর আয় ২৫ শতাংশ কমলে, দেশগুলোর জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে ৭ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রতি মাসে ১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রাজস্ব হারাচ্ছে ইউরোপের পর্যটন খাত। এরই মধ্যে পর্যটন খাতে বিধিনিষেধ শিথিল করতে শুরু করেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। তবে বিমানবন্দর আর সীমান্ত নিরাপদ রেখে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ চালু করাটাকেই এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পর্যটকদের স্বপ্নের নগরী গ্রিসের এথেন্স। মৌসুম এলে এ শহরে যুক্তরাষ্ট্র আর অস্ট্রেলিয়ার পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি একদমই আলাদা। করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত এথেন্সের হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো।
আমাদের দেশে পর্যটন খাত ততটা উন্নত না হলেও এর সঙ্গে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। যেমন টোয়াবের প্রায় ৭০০ সদস্য রয়েছেন। এর বাইরে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বার, বিমান, নৌ ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবসায়ের বড়ো অংশ আমাদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এসব বিবেচনায় পর্যটন খাতের সঙ্গে সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি জড়িত বলা যায়।
বিশ্বের পর্যটন থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ আয়কারী ও লগ্নিকারী দেশ ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইতালি, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, আমেরিকা, দুবাই এখন চরম ভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের মতে ২০২০ সালের মহামারিতে হোটেলগুলো ১২৪ বিলিয়ন ডলার হারানোর পথে। যা কিনা সম্ভ্যাব্য আয়ের ৫০ শতাংশ। আর এসব হোটেল গুলোর ৭০ শতাংশ কর্মী বিভিন্ন কারণে চাকরি হারাবে। বর্তমানে আমাদের দেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন খাত। আর পর্যটন খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
