মো. বশিরুল ইসলাম
বাঙালির রসনা তৃপ্তির মাস জ্যৈষ্ঠ। ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা অঞ্চলের গোবিন্দভোগ আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। এর পরই বাজারে আসবে গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, হিমসাগর বা খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, বারি আম-২, ফজলি, বারি আম-৩, বারি আম-৪ এবং আশ্বিনা আম দিয়ে মৌসুম শেষ হবে।
স্বাদে-গুণে ভরা আম হলো ফলের রাজা। কিন্তু কেনার সময় সন্দেহ জাগে, এগুলো খাঁটি আম তো? মানে ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড রাসায়নিক দিয়ে আম পাকানো হয়েছে কি না? এ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। একবার ভাবুন তো সারা বছর বিদেশ থেকে আসা এত আপেল, কমলা, নাশপাতি, স্ট্রবেরি, প্যসন ফ্রুট, ড্রাগন ফ্রুট, আঙ্গুর, খেজুর ইত্যাদি মাসের পর মাস পচে না। তারা কোনো কিছুই দেয় না? আর আমাদের দেশের আমচাষিদের আম কিনতে গেলে সব বিষে ভরা! আমি মনে করি, এতে দেশীয় আমচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর দেশীয় ফলের বাজার চলে যাচ্ছে বিদেশি ফল আমদানিকারকদের হাতে। দেশি এবং বিদেশি ফলে ফরমালিন দেওয়া হয়—এটা সম্পূূর্ণ ভুল ধারণা।
২০১৪ সাল থেকে ফরমালিনবিরোধী অভিযান শুরু। গ্রীষ্মকাল ফলের ভরা মৌসুম, তখন ঢাকাসহ সারা দেশে অভিযান চালানো হয়। আমে বিষাক্ত ফরমালিনসহ নানা রকম রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ এনে ঢাকা শহরের সবগুলো প্রবেশমুখে ব্যাপক তল্লাশি করে ট্রাক ট্রাক আম ধ্বংস করা হয়। পরবর্তীকালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, যে যন্ত্র দিয়ে ফরমালিন মাপা হয়েছিল তা বাতাসে ফরমালডিহাইড মাপার যন্ত্র। তিনটি সংস্থার পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে হাইকোর্ট সেই যন্ত্রটিকে অকার্যকর ঘোষণা করেন। সম্প্রতি এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তাঁরা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বলছেন, ফলে ফরমালিন মেশালে তা সংরক্ষণে কোনো ভূমিকা রাখে না। এর পক্ষে স্বীকৃত সংস্থাগুলোর গবেষণা ও দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের অভিমত সামনে এনেছেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে এখনো এক তৃতীয়াংশ লোক অপুষ্টিতে ভোগে সেখানে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কয়েক হাজার মণ আম ধ্বংস করা কতটুকু যৌক্তিক? জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মতে, প্রতিদিন আমাদের ফল এবং সবজি খাওয়া দরকার ৪০০ গ্রাম, সেখানে আমরা খাই মাত্র ২৪৮ গ্রাম। যেখানে আমরা এমনিতেই কম খাই সেখানে কেমিক্যালের ভয়ে খাওয়া বন্ধ করে দিলে এর ঘাটতি থেকেই যাবে। ধ্বংস করার আগে অবশ্যই ক্ষতিকর এবং উপকারের মাত্রা হিসাব-নিকাশ করা উচিত।
আমের ফরমালিন ব্যাপারে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আমার কথা হয়। তাঁরা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিকভাবেই প্রত্যেক ফল ও শাকসবজিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় (গড়ে ৩-৬০ মিলিগ্রাম/কেজি) ফরমালডিহাইড থাকে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। ফল, শাকসবজি এসব ফাইবার। এখানে ফরমালিন দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কেউ যদি না বুঝে দেয়ও, তাহলেও কোনো কাজে আসবে না। সংরক্ষণে কোনো ভূমিকা রাখবে না। কারণ এখানে কোনো প্রোটিন নেই। এছাড়া ফল পাকানোর জন্য কার্বাইড ও ইথোফেন ব্যবহার করা হয়, যা সারা বিশ্বে নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার হয়ে আসছে। কার্বাইড ফলের মধ্যে প্রবেশ করে না, কার্বাইড হিট উত্পন্ন করে, যা আম অথবা অন্য ফলকে পাকাতে সাহায্য করে। আর ইথোফেন কিংবা কার্বাইড দিয়ে পাকানো আমের স্বাদ কিছুটা তারতম্য মনে হলেও এর পুষ্টি উপাদানে খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। আর ইথোফেন প্রয়োগ করা হলেও সেটা ২৪ ঘণ্টা কম সময়ের মধ্যেই নির্ধারিত মাত্রার নিচে চলে আসে।
আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তৈরি করে ফলমূল, শাকসবজি। তাই মনের সন্দেহ ছেড়ে প্রকৃত সময়ে পাকা আম খেতে হবে।
ঢাকা
