সাধন সরকার
পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। ঋতুবৈচিত্র্য ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের সম্পর্ক থাকায় একই রোগ ভিন্ন ভিন্ন ধরন ও লক্ষণ নিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে প্রভাব পড়ছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর। আগে যেসব জায়গায় মশা টিকতে পারত না, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সেসব জায়গায় মশার বংশবিস্তার হচ্ছে! বিশেষ করে বৃষ্টির সময় পানি জমে থাকার কারণে অ্যাডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গুর মৌসুম ধরা হয় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে। তবে অ্যাডিস মশা বিস্তারে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নেয় মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত। সবার মনোযোগ এখন বৈশ্বিক মহামারি করোনার দিকে। তবুও এ সময় ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে। তা না হলে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে ডেঙ্গু এ বছরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ বছর অ্যাডিস মশা বিস্তারের ঝুঁকি একটু বেশি! কেননা লকডাউনের কারণে রাজধানী ঢাকার অনেক মানুষ আগেই গ্রামে চলে গেছে। আবার বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ। ফলে বৃষ্টির পানি বাড়ি ও অফিস-আদালতের ছাদ, পরিত্যক্ত বাসাবাড়ির আশপাশে জমার কারণে অ্যাডিস মশা বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মশা নির্মূলে প্রত্যেক বছর ব্যাপক বাজেট হয়, আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা হয়, কিন্তু পরের বছর আবার সেই চিরচেনা আতঙ্ক!
গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মশার লার্ভাগুলো পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয় এ সময়। তাই অ্যাডিস মশার বিস্তারের মৌসুমে তো বটেই, বছরের অন্যান্য সময়ও ওষুধ ছিটানোর ওপর জোর দিতে হবে। আবার মশা নির্মূলে শুধু ওষুধ প্রয়োগ করলেই যে অ্যাডিস মশার বিস্তার রোধ হবে—এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই! তিনটি বিষয় এখানে বিবেচনায় আনতে হবে। বিষয়গুলো হলো—১. সার্বিক পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা (সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ) ২. ওষুধ ছিটানো (কর্তৃপক্ষের কাজ) ৩. জনগণের দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা (জনসাধারণের কাজ)। সার্বিক পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নগরের খাল, নালা, সব ধরনের জলাশয়, রাস্তাঘাট, পার্ক-উদ্যান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ওষুধ ছিটাতে হবে পরিকল্পিত এবং যথাযথ ভাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। জনসাধারণকেই তাদের বাসাবাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখাসহ ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, পানির ট্যাংকের বহু দিনের জমে থাকা পানি, ছাদবাগানের পানি, নারকেলের খোলায় জমে থাকা পানি, এসি-ফ্রিজে কয়েকদিনের জমে থাকা পানি পরিষ্কারসহ মশার বংশবিস্তারের সব ধরনের উত্সস্থল ধ্বংসে সচেতন হতে হবে। স্যাঁতসেঁতে বা উপযুক্ত পরিবেশে ডেঙ্গুবাহী অ্যাডিস মশা দুই বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই বছরব্যাপী অ্যাডিস মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে ধারাবাহিক অভিযান সক্রিয় রাখতে হবে। সর্বোপরি মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার বিকল্প নেই।
ঢাকা
