মহামারি করোনায় কাজ না থাকায় অধিকাংশের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে
মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
৩০ হাজার আটকেপড়া পাকিস্তানির বাস রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে। ক্যাম্পটি ঘিঞ্জি, সরু গলি আর ছোটো ছোটো ঘরে তাদের বাস। অত্যন্ত ঘনবসতি থাকায় করোনা সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ ক্যাম্প। অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে কয়েক হাজার মানুষের বাস। একই শৌচাগার ব্যবহার করেন বহু মানুষ। ক্যাম্পের প্রবেশমুখে লকডাউন নির্দেশনা থাকলেও পরিস্থিতি আমলেই নিচ্ছেন না কেউ। তাদের মধ্যে নেই সর্তকতার ছোঁয়া বা নিয়ম মানার কোনো বালাই।
ক্যাম্পবাসী জানান, ‘লকডাউনের মধ্যে তাদের ক্যাম্পে দুই জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। তবে তারা করোনায় মারা গেছেন কি না তা জানেন না।’ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের কথা বলা হলেও সম্পূর্ণ উলটো চিত্র চোখে পড়ে জেনেভা ক্যাম্পে। ক্যাম্পের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এদের কোনো আয় নেই। এদের অধিকাংশের ছোটো ছোটো পানের দোকান, কাপড় সেলাই কিংবা মাংসের দোকানের কর্মচারী, রিকশাচালক, অটোরিকশা চালক। দিনের রোজগারে দিন চলতো তাদের। এখন সবাই বেকার। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের।’
ক্যাম্পে গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতির কথা জেনে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে এগিয়ে আসেন একে একে সবাই। জানালেন তাদের অভাবের কথা, তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে না খেয়ে থাকার কথা। তাদের একটাই কথা—‘এবার কি সাহাস্য আসেবে আমাদের জন্যে’। কথা হয় নিম্মি নামে এক তরুণীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুই ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে ক্যাম্পের এক খুপরিতে তার বসবাস। স্বামী একটি জরি-চুমকির দোকানের কর্মচারী। এখন দোকান বন্ধ। ঘরে খাবার নেই। সামান্য ত্রাণ সহায়তাও তাদের চলে না। একই ধরনের জীবনের গল্প শোনালেন কুলসুম, ইয়াসমিন, মিন্নি, আয়শা ও সামসাদ মিয়া। তারা বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে তাদের এখন জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন কাজে যাওয়া।’
সামসাদ মিয়া বলেন, ‘একটি মাংসের দোকানে কাজ করে দিনে ২৫০ টাকা মাইনে পেতেন তিনি। তা দিয়েই সংসার চলতো। এখন ঐ দোকান বন্ধ। ফলে বাড়িতেও খাবার নেই।’ তিনি জানান, ‘খাবার জন্যে এখন যেকোনো কাজ করতে রাজি তিনি। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ গরু-মহিষের মাংসের জোগানদাতা জেনেভা ক্যাম্পের কয়েকজন ব্যবসায়ী। ওয়াসি আলম বশিরসহ ক্যাম্পের অনেকে জানান, ‘ঐ মাংসের জোগান এখন বন্ধ’। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়জন জানান, ‘এখনো গভীর রাতে সীমিত আকারে গরু জবাই করে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়।’
আবার ক্যাম্পের ভেতরে দেখা গেল দুই-তিনটি মাংসের দোকান খোলা। কারা ক্যাম্পে মারা গেলেন—জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, ‘তারা হলেন—আলাউদ্দিন (৭০), নিজামউদ্দিন (৭৫), ওসমান (৭৫), শাহজাহান (৬৫), মমতাজ কাদেরী (৭২), মুসলিম (৬১), মুর্তজা (৪০), শফিক (৭৫), এরশাদ (৩০), জিসান (৭) ও খায়রুন্নেছা (৫১)। তাদের কেউ করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কি না তা জানা যায়নি।’
