মু সলিম জীবনে প্রতি বছর মাহে রমজান হাজির হয় রহমত, নাজাত ও মাগফিরাতের বারতা নিয়ে। একটি টেকসই ও আদর্শ জীবন গঠনের অসংখ্য শিক্ষা নিয়ে আসে রমজান। ইসলাম সাম্য-মৈত্রী, খোদাভীতি, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, শৃঙ্খলা, মমত্ববোধ, দান, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের যে মহান শিক্ষা দিয়েছে তার বাস্তবায়নের সুযোগ এনে দেয় রমজানের সিয়াম সাধনা। দেখতে দেখতে আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে গেল রমজান। তবে রমজান আমাদেরকে যে শিক্ষাগুলো দিয়ে গেল তা মেনে চললে আমরা খাঁটি মুমিন হয়ে আল্লাহর একজন প্রিয়বান্দা হয়ে এ জগত্ থেকে যেতে পারব। রোজার প্রথম শিক্ষা ছিল তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া মানে খোদাভীতি বা আল্লাহর ভয়। রমজান আমাদেরকে সব থেকে বেশি শিক্ষা দেয় এই গুণটি অর্জনের জন্য। আল্লাহ সুরা বাকারার যে আয়াতে রোজা ফরজ ঘোষণা করেছেন সে আয়াতের শেষাংশে বলেছেন—‘যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ একজন রোজাদার ব্যক্তি চাইলেই ঘরের কোণে চুপিচুপি কিছু খেতে পারতেন, তৃষ্ণা মেটাতে পারতেন, ক্ষুধা নিবারণ করতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা করেননি। একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে রোজা রেখেছেন, তাকে হাজির-নাজির জেনে সব নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। তাই রোজা-পরবর্তী সময়ও একজন মুমিন আল্লাহকে ভয় করে চলবেন, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করবেন, রোজা সে শিক্ষাই দেয়।
রোজা আমাদের শিখিয়েছে আত্মসংযম। মানুষের মধ্যে যেমন ফেরেশতার স্বভাব বা সুস্বভাব থাকে তদ্রুপ তার মধ্যে পাশবিক বা ইবলিসি স্বভাব থাকে। এ পাশবিকতা তাকে স্বেচ্ছাচারিতার পথে নিয়ে যায় এবং সংযমহীন রূপে গড়ে তোলে। এর ফলে সমাজে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়। কেননা একশ্রেণির অসংযোমী উচ্ছৃঙ্খল লোক অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে এবং সীমা লংঘন করে। রোজা আমাদের সীমা লংঘন থেকে বাধা দেয়। রোজা আমাদের ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়েছে। ইফতারের সব সরঞ্জাম প্রস্তুত কিন্তু সময়ের আগে আমরা বিন্দু পরিমাণও গ্রহণ করিনি। এটাই ধৈর্য। কেউ আমাকে গালি দিয়েছে কিন্তু আমি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছি। কেউ আমার ওপর বাড়াবাড়ি করলেও আমি রোজাদার বলে তাকে পালটা আঘাত করিনি—এসবই ধৈর্য। ইবাদতের ক্ষেত্রেও রমজান আমাদেরকে প্রবল ধৈর্য শিক্ষা দিয়েছে। প্রতিদিন রোজা রেখে যে আমরা এশার নামাজ পড়ে ২০ রাকাত তারাবি আদায় করেছি—এটা কি ইবাদতের ধৈর্য নয়? অন্যান্য মাসে যেখানে কেবল ফরজ নামাজগুলো পড়তেই আমাদের অলসতা চলে আসে সেখানে রমজান আমাদেরকে ইবাদতে ধৈর্য ধারণের শিক্ষা হাতে-কলমে দিয়ে গেছে।
রোজা মানুষকে শিখিয়ে গেছে সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা। মানুষ সাধারণত মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে চায় না। কারণ যে ব্যক্তি অভুক্ত থাকেনি সে কি রূপে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করবে? তাই সুদীর্ঘ একটি মাসের সিয়াম সাধনা ধনি-গরিব নির্বিশেষে সবার পানাহার থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে সবাই অভুক্তের ক্ষুধার জ্বালা উপলব্ধি করতে শিখিয়ে গেছে। মুসলমানদের মধ্যে কেবল এমন সহানুভূতি ও মমত্ববোধ শিক্ষা দেয় রমজান।
রোজা আমাদের পরিমিত আহার করার কথা শিখিয়েছে। পেটপুরে আহার করতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। রমজান মাসে আমরা পেটপুরে আহার থেকে বিরত থেকেছি। ইফতারে যতটুকু সম্ভব খাদ্য গ্রহণ করেছি, বেশি খেলে তারাবি পড়তে অসুবিধা হবে সে কথা ভেবে রাতে কম খাবার গ্রহণ করেছি। সেহরিতে কম খেয়েছি; লক্ষ্য রেখেছি যে, বেশি খেলে সমস্যা হতে পারে। এই যে পরিমিত পরিমাণে আহারের একটা অনুশীলন পুরো রমজান জুড়ে চলেছে এটাকে খুবই গুরুত্ব দিতে হবে। পরিমিত আহারের মাধ্যমেই আমরা সুস্থ জীবন লাভ করতে পারব।
রোজা আমাদেরকে শিখিয়েছে সুশৃঙ্খলাবোধ। সেহরি থেকে শুরু করে তারাবিহ পর্যন্ত প্রতিদিন যে সুশৃঙ্খলাবোধ রমজান আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে তা আমাদের জীবনে জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রমজান মাসে রোজাদারের একটা রুটিন থাকে, যে রুটিন অনুযায়ী পুরো দিনটা তাকে অতিবাহিত করতে হয়। রমজান প্রদত্ত এ রুটিনখানা রমজান-পরবর্তী সময়েও আমাদের কল্যাণের স্বার্থে মেনে চলতে হবে।
আমরা যারা কোরআন তেলাওয়াত করতে পারি রমজানের প্রতিদিনই আমরা কিছু তেলাওয়াত করেছি, কোরআন খতম দিয়েছি, অনেকে একাধিক খতমও দিয়েছেন। মোটকথা রমজান মাসে আমাদের মধ্যে কোরআন তেলাওয়াতের আগ্রহ বেশি থাকে। রমজান পরবর্তী সময়েও আমাদের এ ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। তাহলে আল্লাহর কোরআনের সঙ্গে আমাদের একটা ভালোবাসা তৈরি হবে। যারা অর্থ বুঝেন বা অনুবাদ দেখে পড়তে পারেন তারা অবশ্যই অনুবাদ পড়বেন। আল্লাহ মানবজাতির কল্যাণে কোরআনে কী বলেছেন—তা জানতে পারবেন। প্রতিদিন কিছু নফল ইবাদত করারও চেষ্টা করবেন। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নফল ইবাদত বড়ো সহায়ক। রমজানে আমাদের তাহাজ্জুদ পড়ার যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে, তা জারি রাখতে হবে। শেষ রাতের চোখের পানি আল্লাহর কাছে বড়ো প্রিয়।
রোজা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে গরিবদের সহযোগিতা ও অপরকে খাওয়ানো। রমজান আসলেই যাকাতের প্রতি আমাদের বিশেষ নজর এসে যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় সবাই হকদারদের যাকাত প্রদান করে থাকেন। আবার অনেকে দান-সাদকাও করে থাকেন। এই দানের ফলে সমাজে যারা অসহায় গরিব-এতিম-মিসকিন আছেন তাদের প্রতি আমাদের বিশেষ সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়। রমজান-পরবর্তী সময়েও আমাদেরকে এ দানের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজানে আমরা যেভাবে মানুষকে ইফতার-সেহরি খাইয়েছি, রমজান-পরবর্তী সময়েও ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার করাতে হবে, মানুষকে আদর-আপ্যায়ন জারি রাখতে হবে। রমজানের এ শিক্ষাগুলো তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন আমরা এ শিক্ষাগুলো বাকি ১১ মাসে প্রয়োগ করব। আল্লাহ আমাদেরকে রোজার শিক্ষগুলো পালন করার তাওফিক দান করুন, আমিন।
লেখক : আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মোতাওয়াল্লি
