শাওয়াল মাস

আমল ও ফজিলত

আপডেট : ২৮ মে ২০২০, ২০:২৫

ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে আমাদের থেকে ইবাদতের বসন্তকাল মাহে রমজান। এখন মহা ফজিলতের বার্তা নিয়ে চলছে পবিত্র শাওয়াল মাস। মাসটির রয়েছে অনেক গুরুত্ব ও তাত্পর্য। শাওয়াল আরবি শব্দ। শাওলুন থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো—বাইরে বের হওয়া। যেহেতু আরববাসী এই মাসে ভ্রমণের জন্য ঘর থেকে বের হতো, এজন্য এই মাসের নাম রাখা হয়েছে শাওয়াল। এ মাসে যে ব্যক্তি হারাম ও পাপাচারের কাজ থেকে বিরত থাকবে সে জান্নাতের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে। হজরত লুত (আ)-এর জাতির অপকর্মের কারণে তাদের ওপর জমিনের যে অংশ উলটিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটি ছিল শাওয়ালের পহেলা তারিখ। হজরত সালেহ (আ)-এর উম্মত শাওয়ালের পহেলা তারিখ বৃহস্পতিবার দিন আজাবে নিপতিত হয়। হজরত নূহ (আ)-এর উম্মত শাওয়াল মাসেই প্লাবনে নিমজ্জিত হয়। হুদ (আ)-এর জাতি কওমে আদকেও শাওয়ালের ১ তারিখ বুধবার দিন আজাব গ্রাস করেছিল।

শাওয়াল মাসের আমল : আরবি চান্দ্র বছরের দশম মাস হলো শাওয়াল। এটি হজের তিন মাস তথা শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজের প্রথম মাস এবং হারাম বা সম্মানিত চার মাসের একটি হলো শাওয়াল। এই মাসের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ। পহেলা শাওয়াল সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা এবং ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব। এই মাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে হজের। এ মাস হজ ও জিয়ারতের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত।

শাওয়াল মাসের সুন্নত : এ মাসে বিয়ে-শাদি সুন্নত, যেরূপ শুক্রবারে, জামে মসজিদে ও বড়ো মজলিসে আকদে নিকাহ অনুষ্ঠিত হওয়া সুন্নত। কারণ, মা আয়েশা (রা)-এর বিয়ে শাওয়াল মাসের শুক্রবারে মসজিদে নববিতেই হয়েছিল। (সহিহ মুসলিম)

ছয়টি সুন্নত রোজা : এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হচ্ছে শাওয়ালের ছয় রোজা। ছয়টি নফল রোজা রাখা সুন্নত। রসুল (স) নিজেও শাওয়ালের রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রাখার নির্দেশ দিতেন।

শাওয়ালের রোজার ফজিলত : সারা বছর রোজার সওয়াব হবে শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখার মাধ্যমে। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যারা রমজানে রোজা পালন করবে এবং শাওয়ালে আরো ছয়টি রোজা রাখবে; তারা যেন পূর্ণ বছরই রোজা পালন করল (সহিহ মুসলিম, হাদিস :১১৬৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৩৩)। এক বছরের রোজার সওয়াব এভাবে হয় যে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমের সুরা আনআমের ১৬০ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, যে লোক একটি নেকি করবে সে লোক দশগুণ বেশি সওয়াব পাবে।  সে হিসেবে রমজানুল মোবারকের ৩০ রোজা ৩০০ রোজার সমান হলো। আর শাওয়ালের ছয়টি রোজা ষাট রোজার সমান, এভাবে ৩৬টি রোজা বছরের মোট ৩৬০টি রোজার সমান হয়ে গেল। তা ছাড়া অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত সাওবান (রা) বর্ণনা করেন—রসুল (স) এরশাদ করেন, রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান, সুতরাং এই হলো এক বছরের রোজা (সুনানে নাসায়ি ২/১৬২)। হজরত উবাইদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রসুল (স)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রসুলাল্লাহ! আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তখন রসুল (স) বললেন, তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখ এবং রমজান-পরবর্তী শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখ, তাতেই সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে। (সুনানে তিরমিজি ১/১৫৭)

শাওয়ালের রোজার উপকারিতা : এ রোজা সুন্নত নামাজের মতো। সুন্নত নামাজ যেমন ফরজ নামাজের উপকারিতা ও অসম্পূর্ণতাকে পরিপূর্ণ করে। অনুরূপভাবে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রমজানের ফরজ রোজার অসম্পূর্ণতাকে দূর করে এবং তাতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা দূর করে থাকে। আর অতিরিক্ত ছয়টি নফল রোজার সওয়াব তো আছেই। হাশরের দিন ফরজ আমলে সৃষ্ট  ত্রুটিবিচ্যুতিকে নফলের মাধ্যমে পুরা করা হবে।

আল্লামা ইবনে রজব (রহ) বলেন, শাওয়াল মাসে রোজা রাখার তাত্পর্য অনেক। রমজানের পর রাখা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার আলামতস্বরূপ। কেননা আল্লাহ তায়ালা কোনো বান্দার আমল কবুল করলে, তাকে পরেও অনুরূপ আমল করার তাওফিক দিয়ে থাকেন।

শাওয়াল মাসে রোজা রাখার নিয়ম : শাওয়ালের রোজা রাখার উত্তম সময় হলো—ঈদের পরের ছয় দিন। কারণ তাতেই রয়েছে নেক আমলের প্রতি দ্রুত ধাবিত হওয়ার প্রমাণ। রোজাগুলো শাওয়ালের ২ তারিখ থেকেই আরম্ভ করতে হবে এমনটা জরুরি নয়। ধারাবাহিকভাবে রাখতে হবে এটাও জরুরি নয়। মাসের যে কোনো সময় এই রোজা আদায় করা যায়। দু-একটি রেখে মধ্যে বিরতিও দেওয়া যাবে। সোম এবং শুক্রবারও রাখা যাবে। আইয়ামের বিয তথা আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের সঙ্গে মিলিয়েও রাখা যাবে। দু-একটি রোজা রেখে বাকিগুলো না রাখলেও অসুবিধে নেই। এর কাজা করা লাগবে না। কেউ প্রতি বছর রোজাগুলোর গুরুত্ব সহকারে রাখলে কোনো বছর না রাখতে পারলেও গোনাহগার হবে না। রমজানের রোজা কাজা থাকলে কাজা রোজাগুলো আগে আদায় করে নেওয়া উত্তম। তবে শাওয়ালের রোজা আগে রাখারও অনুমতি আছে। নবিজি (স) এর স্ত্রীগণও রমজানের ছুটে যাওয়া রোজাগুলো সাধারণত ১১ মাস পর শাবান মাসে আদায় করতেন।

 লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও মুহাদ্দিস,

জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত,

চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ