মুহম্মদ জাফর ইকবাল
বহু কাল আগে আমি বেশ কয়েক বছর লস অ্যাঞ্জেলস এলাকায় ছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর আমি আবিষ্কার করেছিলাম, সেটি হচ্ছে ভূমিকম্পের এলাকা। একবার একটা মোটামুটি বড়োসড়ো ভূমিকম্পের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর আমার ভেতর ভূমিকম্প নিয়ে এক ধরনের আতঙ্কের জন্ম নিল। আমার বাসাটি ছিল কাঠের, ভূমিকম্পের সময় কাঠের বাসা বেশ নড়েচড়ে এবং অত্যন্ত বিচিত্র এক ধরনের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে এবং সেই শব্দ শুনে আমার আত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে যেতে লাগল। রাতে ঘুমাতে পারি না, বিছানায় বসে থাকি। কোনো উপায় না দেখে তখন একদিন আমি ভূমিকম্পের ওপর লেখা একটা বই কিনে আনলাম, এলাকায় ভূমিকম্প বেশি বলে সেখানে ভূমিকম্পের ওপর বিজ্ঞানী বেশি, গবেষণাও বেশি। মানুষ যেভাবে ডিটেকটিভ বই পড়ে আমি সেভাবে এক নিঃশ্বাসে সেই বইটি পড়ে শেষ করলাম। ভূমিকম্প কীভাবে হয়, সেটি হলে কী হতে পারে তার একেবারে পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ পড়ার পর আমি হঠাত্ করে আবিষ্কার করলাম যে, ভূমিকম্প নিয়ে আমার যে ভয়াবহ একটা আতঙ্ক ছিল সেটি পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে। আমি তখন শুধু যে ভূমিকম্প সম্পর্কে জেনেছিলাম তা নয়, আমি আরো একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছিলাম। সেটি হচ্ছে, যে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না সেটি নিয়ে আমাদের এক ধরনের আতঙ্ক থাকে, বিষয়টি জেনে গেলে আতঙ্ক দূর হয়ে যায়। যত বড়ো দুর্যোগই হোক, বাস্তবমুখী হয়ে সেটার মুখোমুখি হওয়াটাও তখন অনেক সহজ হয়ে যায়।
করোনার দুর্যোগের সময় সারা পৃথিবীতে এই ব্যাপারটা ঘটছে। এটা সম্পর্কে জানে না বলে মানুষের মনে অযৌক্তিক আতঙ্ক অনেক বেশি। শুধু তা-ই নয়, যারা পুরো বিষয়টা সম্পর্কে না জেনে শুধু খণ্ডখণ্ডভাবে সেটা জানেন, তারা বিষয়টাও খণ্ডখণ্ডভাবে বিশ্লেষণ করছেন। যারা অর্থনীতিবিদ তারা শুধু অর্থনীতির দিকটা দেখছেন, যারা ব্যবসায়ী তারা শুধু নিজের ব্যবসার কথা চিন্তা করছেন, শ্রমিকদের ভালোমন্দ নিয়ে তাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। যারা সমাজবিজ্ঞানী তারা সমাজের কী অবস্থা সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, মনোবিজ্ঞানীরা মানসিক স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করছেন, শিক্ষাবিদেরা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে ভাবনা এবং দুর্ভাবনা করছেন এবং আমার ধারণা ডাক্তার-নার্সরা তাদের কাজ নিয়ে এতই ব্যস্ত যে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময়ই পাচ্ছেন না। সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রনেতাদের, সবার কথা শুনে তাদের এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেটি সবকিছুকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়। (তবে সেই রাষ্ট্রনেতারা যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাষ্ট্রনেতা হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাপারটি আলাদা, দোষ দেওয়ার জন্য শুধু একটির পর আরেকটি মানুষ, সংগঠন কিংবা দেশকে খুঁজে বের করতে হবে, তার বেশি কিছু করতে হবে না।)
তবে কিছু কিছু বিষয় অবশ্য আমরা বুঝতে পারছি না, মাস্ক পরার প্রয়োজন আছে কি নেই, সেটি নিয়ে বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশাল বিতর্ক, সেই বিতর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে কি না আমি জানি না কিন্তু এখন সবাই মাস্ক পরছে। হ্যারি পটারের জগদিবখ্যাত লেখিকা জে কে রোলিং জানিয়েছেন, তার সম্ভবত কোভিড-১৯ হয়েছিল, সেটা পরীক্ষা করতে পারেননি কিন্তু তার সব রকম উপসর্গ ছিল। ডাক্তার স্বামীর উপদেশ অনুযায়ী একটা বিশেষ ধরনের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে গেছেন। একজন মানুষ যদি নিজের ঘরের ভেতর বিশেষ এক ধরনের পদ্ধতিতে শ্বাসপ্রশ্বাস নেন তাতে পৃথিবীর অন্য কারো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয় কিন্তু আমি অবাক হয়ে লক্ষ করেছি এই কথাটি বলার জন্য বিশেষজ্ঞরা তার ওপর চড়াও হয়েছেন! কোভিড আক্রান্ত হওয়া অনেক ডাক্তারই নিজের ঘরে আদা চা, গ্রিন টি—এসব খেয়েছেন কিন্তু মুখে সেটা উচ্চারণ করলেই বিশেষজ্ঞরা তাদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। কারণটা কী কে জানে!
যা-ই হোক, আমরা সারা পৃথিবীব্যাপী বিশাল একটা মহামারি একেবারে নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখছি, এর জন্য নিজেদের কী সৌভাগ্যবান বলব না দুর্ভাগ্যবান বলব বুঝতে পারছি না। তবে এটা পৃথিবীর জন্য প্রথমবার নয়, এর আগে অনেকবার হয়েছে এবং মোটামুটি নিশ্চিত ভবিষ্যতেও আরো অনেকবার হবে! ইনফ্লুয়েঞ্জার এরকম একটা মহামারি ১৯১৮ সালে একবার হয়েছিল। তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল অনেক কম, বর্তমান জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ। সেই মহামারিতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল, যেহেতু ১০০ বছর আগে পৃথিবীর মানুষ এত নিখুঁতভাবে হিসাব রাখত না, তাই অনেকে মনে করেন, মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি ছিল, সম্ভবত প্রায় ১ কোটি।
১৯১৮ সালের মহামারিটির নাম স্প্যানিশ ফ্লু-এর নামকরণের ইতিহাসটাও মোটামুটি চমকপ্রদ। তখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে, তাই যেসব দেশ যুদ্ধ করছে তাদের খবর প্রকাশ করায় নানারকম বিধিনিষেধ। মহামারিতে নানা দেশের সৈনিক মারা যাচ্ছে কিন্তু সেসব খবর গোপন রাখা হচ্ছে। সেই মহাযুদ্ধে স্পেন ছিল নিরপেক্ষ দেশ, তাদের খবর প্রকাশে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তাই পৃথিবীর মানুষ ফ্লুয়ের খবর পেয়েছে শুধু স্পেন থেকে, সে কারণে এই ফ্লুয়ের নাম হয়ে গেল স্প্যানিশ ফ্লু! একটা অসুখের নামের সঙ্গে অন্যায্যভাবে একটা দেশের নাম যুক্ত হয়ে যেতে পারে জেনে এবারের মহামারির রোগটির নাম তাড়াহুড়ো করে কোভিড-১৯ দেওয়া হয়েছে। (তার পরও আমেরিকা এটাকে চীনা ভাইরাস হিসেবে পরিচিত করার জন্য কম চেষ্টা করেনি!)
১০০ বছর আগে চিকিত্সার ব্যবস্থা মোটেও উন্নত ছিল না। এখন মানুষ যত কিছু জানে সে তুলনায় তখন মানুষেরা বলতে গেলে কিছুই জানত না। চিকিত্সার জন্য ব্যবহার করা হতো এসপিরিন; কতটুকু এসপিরিন খাওয়া উচিত সেটাও ভালো করে জানা ছিল না; তাই অনেক বেশি এসপিরিন খেয়ে তার বিষক্রিয়াতেও অনেকে মারা গেছে। তবে একটা বিষয় তখনো ঠিকভাবে জানা ছিল, সেটা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। সেটাই ছিল সেই মহামারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র।
সেই স্প্যানিশ ফ্লু এক বার আক্রমণ করেনি, বসন্তকালে প্রথম বার, শরত্কালে দ্বিতীয় বার এবং শীতকালে তৃতীয় বার আক্রমণ করেছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় বার আক্রমণটি ছিল সবচেয়ে ভয়ানক, বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সেই আক্রমণে শিশু ও বৃদ্ধেরা নয়, সবচেয়ে বেশি মারা গিয়েছিল তরতাজা জোয়ানেরা। সময়টি ছিল মহাযুদ্ধের কাল, আমেরিকাতে যত সৈনিক যুদ্ধে মারা গিয়েছিল তার থেকে বেশি মারা গিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লুতে। সেই মৃত্যুর কারণের অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে এবং ১০০ বছর পরেও সেগুলো নিয়ে এখনো গবেষণা হচ্ছে।
এই মহামারিটি যেভাবে একদিন এসেছিল, সেভাবে একদিন চলে গিয়েছিল; কীভাবে এটা নির্মূল হয়েছে তারও নানা রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু আমি বিশেষজ্ঞ নই তাই রোগশোক নিয়ে একটু তথ্য জানাতে পারি কিন্তু তার ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব না। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর একটি মহামারি যেহেতু এক দিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে, আমাদের এই করোনা মহামারিও নিশ্চয়ই একদিন বিদায় নেবে। ততদিন আমাদের শুধু দাঁতে দাঁত চেপে সময়টা পার করতে হবে।
২.
দুঃসময়ে একটুখানি ভালো খবরের জন্য আমরা সবাই উন্মুখ হয়ে থাকি। হোক সেটি খুবই ছোটো একটা ভালো খবর, তবুও সেটুকু শুনলে আমরা বুকে বল পাই; মনে হতে থাকে, এরকম ছোটো ছোটো অনেকগুলো ভালো খবর দিয়েই তো বিশাল বিশাল ভালো খবরগুলো তৈরি হবে।
কোভিড-১৯-এর সেরকম কোনো চিকিত্সা নেই, তার পরও সংবাদপত্রে দুটো চিকিত্সার কথা মোটামুটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে আরোগ্য হয়ে যাওয়া রোগীদের রক্ত থেকে প্লাজমা নিয়ে তার অ্যান্টিবডি দিয়ে চিকিত্সা। অন্যটি হলো রেমডেসিভির নামে একটি ওষুধ, যার ফলাফল শুধু আলাপ-আলোচনায় নয় মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই দুটোই এখন আমাদের দেশে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের ডাক্তারেরা এবং আমাদের ওষুধ কোম্পানি সেগুলো আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে। করোনা সংক্রমণের বিশ্বাসযোগ্য পিসিআর টেস্ট কিট এখনো বাইরে থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে কিন্তু অ্যান্টিজেন অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট আমাদের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করেছে। আমরা খুবই আগ্রহ নিয়ে সেটার জন্য অপেক্ষা করছি। সেটার সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেলে আমরা নিশ্চয়ই একেবারে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা শুরু করতে পারব। ‘ফলস নেগেটিভ’ নিয়ে বিতর্কটি থাকলেও, কতজন আক্রান্ত হয়েছে তার একটা ধারণা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। (এর মধ্যে খবর পেলাম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডক্টর জাফরুল্লাহ করোনাতে সংক্রমিত হয়েছেন, আমরা সবাই তার আরোগ্য কামনা করছি।)
করোনা ভাইরাস শুরু হওয়ার পর পৃথিবীর সব দেশেই তার জিনোম সিকোয়েন্সিং শুরু করেছে, ঠিক কেন জানি না আমরা পিছিয়ে ছিলাম। এখন আমাদের দেশে সেটা শুরু হয়েছে। আশা করছি, শুধু যে সিকোয়েন্সিং হবে তা নয়, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে এই রোগটির গতিপ্রকৃতির অনেক তথ্য বের করে নিয়ে আসা যাবে। আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রী পৃথিবীর দেশেবিদেশে বায়োইনফরমেটিকস নিয়ে কাজ করছে, তারা নিশ্চয়ই এই তথ্যগুলো নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা তাদের মুখ থেকে সেই বিশ্লেষণের ফলাফল জানার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।
সারা পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে আমরা এখন গভীর একটি সুড়ঙ্গের ভেতর আছি, দূরে সেই সুড়ঙ্গ শেষের আলো। সেই আলো ধরে আমরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছি। অতীতে যেহেতু পেরেছি, এবারেও নিশ্চয়ই একসময় সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে বাইরের আলোতে পৌঁছে যাব।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক
