হেনা সুলতানা
‘গহন কোন বনের ধারে’ দ্বিজেন শর্মার প্রায় কবিতার মতো গদ্যে লেখা অনেকবার পড়া বইটা আমাকে সম্মোহিত করে রেখেছে সন্ধ্যা থেকে। করোনার উদ্বেগের ভেতরে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তা্লবে বিধ্বস্ত কোটি মানুষের জীবন! মধ্য জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে হঠাত্ ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ। মাটি ছেড়ে গাছগাছালির শুকনো ডালপালা, ঝরা পাতারা দল বেধে মাঠের উপর দিয়ে, আকাশ ছোঁয়া দালানকোঠা ঘেঁষে, দেয়াল পেরিয়ে কুমুদিনী হাসপাতালের উঁচু ছাদের হলুদ চুড়োর ওপর দিয়ে কোথা থেকে কোথায় উড়ে যাচ্ছে তার ঠিক ঠিকানা নেই। ডাকিনীর শাঁই শাঁই ছুটে যাওয়ার শব্দ পাচ্ছি। খানিক পরে চাতালের টিনের চালে চড়বড় করে বৃষ্টির শব্দে ভাবনার রেস এলোমেলো হয়ে যায়। একটানা বৃষ্টির শব্দ—জনহীন বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, দূরের গ্রাম, ধুলোময় গাছপালা, শুকিয়ে যাওয়া এক চিলতে নদী, সন্ধ্যার তপ্ত চিতা, নাটমন্দিরের তপ্ত রোদে চৌচির উঠোন সব এখন ধুয়ে মুছে সাফ হচ্ছে। ঘূর্ণির বাতাস বাড়তে থাকে। বুকের ভেতর তোলপাড় হতে থাকে।
কোভিডের চোখ রাঙানিতে প্রতিটি মানুষের ঘর এখন এক একটি কারাগার। ধুলোময়, শব্দময়, ধোয়াময়, দুর্গন্ধময় পৃথিবীর নিঃশ্বাস নেবার এই বুঝি সময়! অথচ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমরা ভয়ে কাঁটা হয়ে বসে থাকি পৃথিবীর আঁঁধার খোঁড়লে। পৃথিবীর এই গভীরতর অসুখের দঃসময়ে খুব মনে পড়ছে প্রকৃতিপুত্র অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মাকে। আজ তাঁর জন্মদিন।
দ্বিজেন শর্মা—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে একটি সম্পদ, বৈষয়িক সম্পদ তা আমাদের মনে করিয়ে দিতেন সবসময়। মনে করিয়ে দিতেন আমাদের স্বার্থক্ষুধা এতটাই প্রবল যে নদীগুলোকেও গ্রাস করছি। ভয়ংকর ভবিতব্য আঁঁচ করতে পেরে একটি পরিকল্পিত নগর দেখার ইচ্ছে যাঁকে তাড়িত করত। যিনি কলম হাতে যোদ্ধার মতো সাহস করেছিলেন আদিবাসী অরণ্যজীবনের দর্শন ও বিজ্ঞান থেকে শক্তি নিয়ে দেশের ক্ষত বিক্ষত বনভূমি ও ক্ষয়িষ্ণু প্রকৃতির পক্ষে রুখে দাঁড়াতে। তিনি মনে রেখেছিলেন এবং অন্যকেও মনে করিয়ে দিতেন, ‘রৌদ্র, ব্যপ্তিস্থান ও শ্যামলিমার মতো আদিকালের প্রভাবকগুলোই আমাদের দেহ ও মনের স্রষ্টা। আপন স্বাভাবিক পরিবেশচ্যুত সব জীবের নিয়তি একটিই ধ্বংস, কোথাও দ্রুত, কোথাও শ্লথ আর এই সাধারণ নিয়ম থেকে মানুষের অব্যাহতি নেই। এসব জরুরি জীবনোপকরণ থেকে শহর মানুষকে ছিনিয়ে এনেছে, জবরদস্তি চালিয়েছে, তাদের অভাবি রেখেছে, হতাশ ও অসুখী রেখেছে, নিষ্পিষ্ট করেছে, এমন কি নির্বীর্যও করে ফেলেছে। জীবনের অত্যন্ত জরুরি তিনটি সুখ—রৌদ্র, ব্যপ্তিস্থান ও শ্যামলিমা হারিয়ে অট্টালিকার গর্ভে আটক ও পেট্রোলের ধোয়ার গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষ বড়ো বড়ো শহরে বন্দী ও অসুখী জীবন কাটায়। মানুষের জীবনে প্রকৃতির ওই তিনটি শর্ত পূরণ করা না হলে কখনোই তার দেহ ও মনের স্বাস্থ্যোদ্ধার ঘটবে না।’
আমাদের দেশে এসব কথা কী কেউ মনে রাখে! দ্বিজেন শর্মার দীর্ঘনিশ্বাস ‘কুরচি তোমার লাগি’ গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধে ছড়িয়ে আছে। মানুষ ভেবেছিল একদিন প্রকৃতির ওপর সে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করবে। কিন্তু তার সেই উচ্চাশা এখন হতাশায় পর্যবসিত। প্রকৃতিকে বশ মানাতে গিয়ে আজ সে নিজেই কোণঠাসা। মানুষ এখন প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলতে চায়, কিন্তু প্রকৃতির ভাষা সে জানে না।
‘পৃথিবীর গভীরতর অসুখ’ শিরনামে একটি লেখায় অসাধারণ বর্ষারণ্য মাধবকু্ল ভ্রমণের বেদনাময় স্মৃতি গভীর দীর্ঘশ্বাসের মতো মিশে আছে। ...‘খটখট আওয়াজে হঠাত্ আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে। পাহাড়ের অনেক উপরে কারা গাছ কাটছে। জলমর্মর চাপা পড়ে। প্রতিধ্বনিত এই নিঝুম শব্দস্রোত কর্ণবিদারী হয়ে ওঠে। অসহ্য। আমি ওপরের দিকে তাকাই। জমাট অন্ধকারে কিছুই দৃষ্ট হয় না। খাশিয়াপুঞ্জীর আলোর ফুলকিতে পরিবেশ আরও ভৌতিক হয়ে ওঠে। প্রকৃতির উপর বলাত্কাররত কারা এই লম্পট? করাতকল, ইটভাটার মালিকের লোক? না, সরাসরি তারা কেউ নয়। এ হলো ঘনীভূত লোভের লাল জিহ্বা। আমি চিকো মেন্দিস নই। এই জিহ্বা টেনে ধরার সাহস আমার নেই। অসহায় আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি।’
লাগাতার ভোগবাদ ও অন্যায় লুটতরাজ অত্যাচার নিয়ে আজ গোটা বিশ্ব দুঃসহ যন্ত্রণা পাড়ি দিচ্ছে। সে যন্ত্রণা দ্বিজেন শর্মা প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করতেন। সে যন্ত্রণারই নাম দিয়ে ছিলেন ‘গভীরতর অসুখ।’ তিনি ছিলেন আশাবাদী মানুষ। বলতেন, ‘প্রজ্ঞা মানুষকে চিরদিন সঙ্কট উত্তরণে আনুকুল্য দিয়েছে, এ যুগেও তা ব্যর্থ হবে না। ...সমাজ সজীব সত্তা বিধায় তার অন্তর্নিহিত পুনর্গঠনশক্তি আছে, সে আত্মরক্ষা করতে জানে, এভাবে হয়তো নিজে বাঁচবে, আমাদেরও বাঁচাবে।’ যে করোনা সঙ্কট থেকে নাভিশ্বাস উঠেছে পৃথিবীর, তা থেকে নিশ্চয়ই আমরা একদিন বেরিয়ে আসব। কেবল প্রয়োজন একটি প্রকৃতিবান্ধব ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা ক্রমাগত লোভ ও দখলি মনোভাব থেকে আমাদের সরিয়ে আনবে। ঠিক এরকম একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন দ্বিজেন শর্মা।
জন্মদিনে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
n লেখক : শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস,
মির্জাপুর, টাঙ্গাইল
